বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে চলমান টানাপড়েনের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টনের চুক্তির মেয়াদ মাত্র তিন মাস পর, আগামী ১১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় এই দলিলে পারস্পরিক সম্মতিতে চুক্তির বিধানগুলো কার্যকর রেখে মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ আছে। তবে দেশ রূপান্তরে শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমান চুক্তির বিধানগুলো ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চুক্তিতে অবিকল অনুসরণের বিরুদ্ধে দুই দেশেই নানামুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
যেকোনো দুই বা ততোধিক দেশের ভেতর বয়ে যাওয়া নদীর পানি বণ্টনের আলোচনা শুরু হলেও লাগাতার দরকষাকষি করেও একমত হতে বছরের পর বছর কেটে যায়। গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। বাংলাদেশের সামনে যে সমস্যা বড় হয়ে আসছে তা হলো আগামী ১২ ডিসেম্বর থেকে গঙ্গার পানি কীভাবে বণ্টিত হবে, সে আলোচনা গতকাল পর্যন্ত শুরুই হয়নি। চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আলোচনা সহসা শুরু হওয়ার কোনো ইঙ্গিত এখনো নেই। তাই আমরা মনে করি, এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের সরকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরির জন্য গঙ্গা চুক্তি প্রসঙ্গ কাজে লাগাতে পারে। কীভাবে? এক্ষেত্রে একসঙ্গে দুটি কাজ দুই সরকারকেই করতে হবে। প্রথমত : ৩০ বছরের জন্য সই হওয়া বর্তমান চুক্তিটি নবায়নযোগ্য। তাই মেয়াদ শেষের আগেই শূন্যতা তৈরি হওয়া এড়াতে বর্তমান চুক্তির মেয়াদ স্বল্পমেয়াদের জন্য, যেমন দুই থেকে পাঁচ বছর বাড়ানো যেতে পারে। দ্বিতীয়ত : দুই দেশেরই প্রয়োজন মেটাতে ভবিষ্যতের জন্য আরেকটি চুক্তির রূপরেখা তৈরি করতে একটি উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি গঠন করে অবিলম্বে কাজ শুরুর নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে দুই দেশেরই সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ের সদিচ্ছার প্রয়োজন হবে।
১৯৯৬ সালের চুক্তি সইয়ের সময় সবচেয়ে বড় বিবেচ্য ছিল বাংলাদেশের জন্য শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় কখন কতটা পানি ছাড়া হবে। সে তুলনায় ভবিষ্যতের চুক্তিতে দুই দেশের একমত হওয়া সহজ হবে আমাদের এমনটি মনে হয় না। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ও উজানে পানি প্রত্যাহারসহ নানা কারণে গঙ্গায় বাস্তব প্রবাহ ভবিষ্যতে কতটা মিলতে পারে, নেপাল-ভুটানকে যুক্ত করে সেসব দেশে গঙ্গার উজানে জলাধার নির্মাণ করে প্রবাহ বাড়ানো যাবে কি না বা এমন সিদ্ধান্ত আদৌ নেওয়া হবে কি না, নদীর জন্য প্রাকৃতিক প্রবাহের বরাদ্দ রাখা হবে কি না, বাংলাদেশকে শুষ্ক মৌসুমে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি দেওয়া হবে, এমন একটি সুরক্ষা-ধারা যুক্ত করা হবে কি না এমন অনেক প্রশ্ন দুই দেশের মধ্যে দরকষাকষির পর্যায়ে আসতে পারে।
বিশাল গঙ্গা অববাহিকায় ভাটির দেশ হওয়ায় পানি বণ্টনের চুক্তি হওয়া এবং তা কার্যকর থাকা বাংলাদেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কার ভাটিতে পানিপ্রবাহ কমে গেলে গঙ্গা-পদ্মা এবং তাদের শাখা নদীগুলোর প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল জনপদে সেচ, কৃষি, মৎস্য, সুপেয় পানি ও নৌচলাচল বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। লবণাক্ততা বাড়ে। নদীগুলো পরিবেশগতভাবে হুমকির মুখে পড়ে। তাই বাংলাদেশ চায় অনুমানযোগ্য পানি-প্রাপ্যতার জন্য একটি নিশ্চিত ব্যবস্থা। সরকারকে মানুষের স্বার্থরক্ষায় অবিলম্বে জোরালো প্রস্তুতি নিতে হবে।
ভারত প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমস্যার দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে সমাধান খোঁজে। উজানের দেশ হওয়ায় বর্তমান চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের চুক্তির ক্ষেত্রে দেশটি কী দৃষ্টিভঙ্গি নেবে তার ওপর গঙ্গা-পদ্মার প্রবাহ তো বটেই, দ্বিপক্ষীয় অন্য বহু ইস্যুর সমাধান নির্ভর করতে পারে। সেদিক থেকে আগামী কয়েক মাস এমনকি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
অভিন্ন ৫৪টি নদীর মধ্যে দুই দেশের চুক্তি আছে কেবল গঙ্গার পানি বিষয়ে। এ কারণে নদীর পানি বণ্টন দ্বিপক্ষীয় বিরোধে বড় কাঁটা হয়ে আছে। তিস্তাচুক্তির খসড়ায় একমত হয়েও সই করা থেকে ২০১১ সালে শেষ মুহূর্তে ভারতের পিছিয়ে যাওয়ার নজির আছে। তাই গঙ্গা নিয়ে ভারত এবার কী সিদ্ধান্ত নেয় তা থেকে স্পষ্ট হবে দেশটি কি দ্বিপক্ষীয় বিরোধগুলো জিইয়ে রাখবে, নাকি গঙ্গা চুক্তিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন যুগের সূচনার জন্য কাজে লাগাবে।