হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও কর্তৃপক্ষের দায় 

গত ৯ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরে ‘প্রক্রিয়াজাত খাবারে ভয়ংকর ভারী ধাতু, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশুরা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে তা জনস্বাস্থ্যোর জন্য কতটা বিপজ্জনক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিরাপদ খাদ্যপণ্যের অনিশ্চয়তা কঠিন সংকটের সৃষ্টি করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দেশের বাজারে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবারে উদ্বেগজনক মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষণায় ৩২টি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য পরীক্ষা করে বিশেষ করে সিসা ও ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি উদ্বেগজনক মাত্রায় পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৩২টি পণ্যের মধ্যে ৩১টিতেই শিশুদের সম্ভাব্য অ-ক্যানসারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারিত মাত্রার ওপরে পাওয়া গেছে। গবেষণাটি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এবং পরিবেশবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের গবেষকদের পাশাপাশি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব উলংগংয়ের গবেষকদের অংশগ্রহণে পরিচালিত হয়েছে। গবেষণায় ছয়টি ভারী ধাতু সিসা, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, তামা ও নিকেলের পরীক্ষা হয়। সেখানে ক্রোমিয়াম, নিকেল, তামা ও সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

এ যেন জীবন নিয়ে জুয়া! ‘খাদ্যপণ্য সন্ত্রাসী’রা নিজেদের আখের গোছাচ্ছে  বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন বিপন্ন করে। খাদ্যে ভেজাল নিয়ে কয়েক বছর ধরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য প্রতিবেদন। ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয় কিছুদিন পরপর। খাবারের মান নির্ণয় করতে রেস্তোরাঁগুলোর জন্য গ্রেডিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে শুনেছিলাম। কিন্তু সবকিছুর পরও, দূষিত ও ভেজাল দেওয়ার বিষয়টি যেন নির্ভেজালই থেকে গেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষ জেনে বা না জেনে অথবা কোনো উপায় না পেয়ে, বাধ্য হয়ে নিম্নমানের খাবার খাচ্ছে। শুধু হোটেল-রেস্তোরাঁ নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় সিংহভাগ পণ্য বিষক্রিয়ার বাইরে নয়। অনিরাপদ খাদ্যপণ্য বিষের সমতুল্য।

এ ধরনের খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্বল বাজার মনিটরিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষ বিষাক্ত খাবার গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। এটি কেবল শুধু অপরাধ নয়, নীরব জাতিবিনাশী কাণ্ড। ভেজাল খাদ্যপণ্য আমাদের সমাজের দীর্ঘকালীন একটি গুরুতর সংকট। গত ২২ আগস্ট দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মুদি দোকান থেকে শুরু করে সুপারশপ সবখানে চকচকে মোড়কে বিস্কুট, চকোলেট, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, চিপসসহ বিভিন্ন ধরনের স্ন্যাকসের সম্ভারে ভরপুর। এসব খাবারের দাম কম, সহজলভ্য, বিজ্ঞাপন আকর্ষণীয়। বিশেষ করে, শিশুদের খুব সহজেই আকৃষ্ট করেছে মনোলোভা মোড়কের খাবার। তবে মোড়কের ভেতরে রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকির উপাদান। নির্ভেজাল কিংবা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকির কারণ নয় এমন কোনো খাদ্যপণ্য আছে কিনা, এ নিয়ে সংশয় আছে। 

বাংলাদেশে প্রস্তুত ওষুধ মানসম্মত ও বিশে^ প্রশংসিত। কিন্তু দেশের বাজার মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে সয়লাব! তা ছাড়া ভেজাল ওষুধ বেচাকেনা নির্মম বাস্তবতার চিত্র ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে কম উঠে আসেনি। ফরমালিন ও বিষাক্ত রাসায়নি গ্রাস করেছে, ফলমূল-শাকসবজি-মাছ আরও কত কিছু। মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ে যারা তুঘলকিকাণ্ড চালাচ্ছে, তারা জনশত্রু। এদের ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়। ব্যবসায়ী নামের খাদ্যপণ্য সন্ত্রাসীদের রোগটা যেহেতু গুরুতর, সেহেতু এর প্রতিবিধানও হতে হবে সেই নিরিখে। প্রয়োজনে বিদ্যমান আইনের সংশোধন জরুরি। নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নে আপসের সুযোগ নেই। এটি শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, জাতির অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন। কতিপয়ের মূল্যবোধে ধস, নৈতিক অবক্ষয়, লোভের থাবা জনস্বাস্থ্যের জন্য যে সংকট সৃষ্টি করেছে তা থেকে নিষ্কৃতির লক্ষ্যে, কঠোর ও লাগাতার আইনানুগ ব্যবস্থার বিকল্প নেই। নিরাপদ খাদ্যের অধিকার মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। খাদ্যনিরাপত্তার ধারণা সম্পর্কে ১৯৮৩ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলেছিল, ‘খাদ্যনিরাপত্তা সব মানুষের সারা জীবনের জন্য মৌলিক খাদ্যপ্রাপ্তির ভৌত এবং অর্থনৈতিক অধিকারের নিশ্চয়তাকে বোঝায়।’ ১৯৯৬ সালে বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনের সুপারিশে বলা হয়েছিল, ‘খাদ্যনিরাপত্তা এমন একটি বিষয়, যেখানে জনগণ সবসময় ভৌত, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পর্যাপ্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যে প্রবেশের অধিকার লাভ করে, তাদের সুস্বাস্থ্য ও কর্মতৎপর জীবনের জন্য স্বাস্থ্য বিধিসম্মত প্রয়োজন মেটায়।’ কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতা এ থেকে কত দূরে, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন।

যেকোনো খাদ্যনিরাপদ হবে কিনা, তা উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বাজারে বিক্রি, রান্না ও পরিবেশন করা এবং খাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ‘নিরাপদ’ করার ব্যাপার আছে। এটি একটি চেইন। কোনো একটি জায়গায় যদি বিঘœ ঘটে, তাহলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। খাদ্য যেখান থেকে উৎপাদিত হয় এবং খাবারের টেবিলে আসার আগ পর্যন্ত যত ধাপ পার হয়ে আসে, তার মধ্যে অনেক কিছু যুক্ত হয়ে খাদ্যকে বিষাক্ত করে তুলছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে পরিবেশদূষণ বন্ধ করা জরুরি। উৎপাদন ক্ষেত্রে এবং পরে সংরক্ষণ ক্ষেত্রে খাদ্য দূষিত হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায়। নিরাপদ খাদ্য বাস্তবায়নে এই দুটি জায়গায় কাজ করা জরুরি। খাদ্যে ভেজাল মেশানো, একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে এবং যারা জড়িত, বিশেষ করে যারা এর মূলহোতা, তারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান। তাই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। কোনো আইন তাদের স্পর্শ করতে পারে না। এটা খুব দুঃখজনক ও প্রশ্নবোধক।

নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় গুণগত পরিবর্তন আবশ্যক। আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে চাষাবাদের জন্য কৃষককে আগ্রহী করতে হবে। এছাড়া এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ ও সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। সচেতনতার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে। গবেষণা সূত্রে জানা যায়, শরীরে ৩৩ শতাংশ রোগ হওয়ার পেছনে রয়েছে ভেজাল খাদ্য। পাঁচ বছরের নিচে শিশুর ৪০ ভাগ রোগ হয় দূষিত খাদ্য থেকে। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে খাবারের টেবিলে আসা পর্যন্ত নানা পর্যায়ে দূষিত হয়। এর মূল কারণ অসচেতনতা। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করতে না পারলে, নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের কথা চিন্তা করা যায় না। কৃষিতে ঢালাওভাবে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার হচ্ছে। ফলে শাকসবজি ও ফলসহ বিভিন্ন খাদ্যের মাধ্যমে কীটনাশক মানুষের দেহে প্রবেশ করছে, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এ বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করতে হবে। সরকার কোন কীটনাশক নিষিদ্ধ করেছে, কোনটার অনুমোদন দিয়েছে এবং কীটনাশক ব্যবহারের বিধিবিধান ইত্যাদি বিষয়ে কৃষকদের সর্বশেষ তথ্য জানা আবশ্যক। অনেক কৃষক বাজারজাত করার সময় খাদ্য দূষিত করেন, ক্রেতা ভালো পণ্যের সঙ্গে ভেজাল পণ্যের মিশ্রণ ঘটিয়ে খাদ্যের দূষণ ঘটায়। এ দূষণ রোধ করার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ নিয়ে এ পর্যন্ত কথা হয়েছে বিস্তর কিন্তু কাজের কাজ যে কিছুই হয়নি, তার ফের প্রমাণ দিয়েছে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন। খাদ্যে ভেজালের দৌরাত্ম্য ঠেকাবে কে এ প্রশ্নের উত্তর কঠিন কিছু নয়। সরকার ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব মানুষকে খাদ্যসন্ত্রাসী চক্রের থাবামুক্ত করা, স্থায়ী প্রতিবিধান জরুরি। এ জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য কেন গড়ে উঠে না? রাজনৈতিক-সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আমাদের মনে রাখা দরকার, জনসংখ্যা বাড়ছে এবং এ নিরিখে  গবেষণা ও উৎপাদন বাড়াতে হবে। অফসিজনে সব ধরনের ফল ও ফসলের উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে বছরজুড়ে পেয়ারা, পেঁপে, কলা, আম, আনারস পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া মানুষকে খাদ্য অপচয়ের বিষয়ে সচেতন ও সতর্ক করতে হবে। উৎপাদন, আহরণ, পরিবহন ও বিপণনের অপচয় ঠেকাতে হবে। খাবার টেবিলে খাবার নষ্ট করা যাবে না। সামাজিক অনুষ্ঠানে খাবার অপচয় বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ না নিলে, খাদ্যে বড় সংকট তৈরি হবে।

নিরাপদ খাদ্যপণ্য, সর্বজনীন অধিকার। মানবাধিকার বটে। এ নিয়ে যারা তুঘলকিকা- চালাচ্ছে তাদের তো বটেই, খুঁটির সন্ধান করে মূলোৎপাটন করতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো অনুকম্পা নয়। উদাহরণযোগ্য প্রতিকার নিশ্চিত করা গেলে সুফল মিলবে। চাই সেই প্রেক্ষাপট তৈরি করা এবং যূথবদ্ধভাবে প্রতিকার-প্রতিবিধানের  লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়া। কতিপয় অসাধু ও লোভাতুরের কাছে জনজীবন জিম্মি হবে আর প্রতিকারহীন থাকবে তা হতে পারে না। জীবনবিনাশী এই অপকাণ্ড ঠেকাতে হবে। সময় অনেক বয়ে গেছে, আর যেন না যায়।  

লেখক : ওষুধ ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক। সাবেক অধ্যাপক ও ডিন ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

drmuniruddin@yahoo.com