সংসদে বিরোধী দলের ওয়াকআউট নিয়ে সরকারদলীয় মন্ত্রীদের কটাক্ষ, স্পিকারের হাস্যরস এবং প্রতিবাদকে তুচ্ছ করে দেখার প্রবণতা বাংলাদেশে পুরনো সংসদীয় সংস্কৃতি। বিরোধী দল নানা বিষয়ে বিরোধিতা করে প্রতিবাদস্বরূপ ওয়াকআউট করতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, সংসদে বিরোধিতাকে সরকার সম্মানজনক উপায়ে গ্রহণ করছে কিনা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শুরু থেকেই বিরোধী জোট কয়েক দফা ওয়াকআউট করেছে। ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় বিরোধী সদস্যরা স্লোগান দিয়ে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন। ৯ এপ্রিল কয়েকটি বিল পাসের প্রতিবাদে আবার ওয়াকআউট হয়। ২৯ জুন অতিরিক্ত কার্যসূচিতে দুটি সংশোধনী বিল তোলার প্রতিবাদে বিরোধীরা সংসদ থেকে বেরিয়ে যান। ১৩ জুলাই সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ার প্রতিবাদেও তারা ওয়াকআউট করেন। সাম্প্রতিক সময়েও কয়েকটি বিলের প্রতিবাদে বিরোধী সদস্যরা কালো কাপড় হাতে সংসদ ত্যাগ করেছেন।
অর্থাৎ ওয়াকআউট এখন বিরোধী জোটের দৃশ্যমান প্রতিবাদ কৌশল। কিন্তু এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সংসদ বর্জনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। প্রথম অধিবেশনের ২৫টি বৈঠকের হিসাবে চারটি বড় ওয়াকআউট ধরলে তা প্রায় ১৬ শতাংশ বৈঠক। এটি আসলে ১৬ শতাংশ সংসদ বর্জন নয়। কারণ প্রতিটি ওয়াকআউটের পর বিরোধী সদস্যরা আবার সংসদে ফিরে এসেছেন। বিএনপির অতীত সংসদীয় আচরণের সঙ্গে বর্তমান বিরোধী জোটের তুলনা করা যাক। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের সপ্তম সংসদে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি প্রায় ১৫৬ দিন সংসদে অনুপস্থিত ছিল। প্রায় ৩৮২ কার্যদিবসের হিসাবে তা ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ বিএনপির সংসদ বর্জন ছিল বর্তমান বিরোধী জোটের কয়েকটি ইস্যুকেন্দ্রিক ওয়াকআউটের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের অষ্টম সংসদে আওয়ামী লীগের বর্জন ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ কার্যদিবস। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের নবম সংসদে বিএনপির অনুপস্থিতি প্রায় ৮২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
অর্থাৎ বর্তমান বিরোধী জোটের প্রথম অধিবেশনের ১৬ শতাংশ বৈঠকে ওয়াকআউটের সঙ্গে বিএনপির সপ্তম সংসদের প্রায় ৪১ শতাংশ সংসদ বর্জনের তুলনা করলে বর্তমান বিরোধী জোটের হার প্রায় ৬১ শতাংশ কম। নবম সংসদে বিএনপির প্রায় ৮২ শতাংশ অনুপস্থিতির তুলনায় এই হার প্রায় ৮০ শতাংশ কম। এই পরিসংখ্যান কোনোভাবেই বর্তমান বিরোধী জোটের প্রশংসাপত্র না। একইভাবে সরকারপক্ষের জন্যও এটি আত্মতুষ্টির কারণ হতে পারে না। আলোচনার বিষয়ে হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধী জোটের প্রতিবাদস্বরূপ ওয়াকআউটে সরকারি দল কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। ৯ এপ্রিল বিরোধী জোট ওয়াকআউট করার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রসিকতার ছলে তাদের ‘ধন্যবাদ’ জানান। একই ঘটনায় আইনমন্ত্রীও বিরোধীদের বক্তব্যকে সংসদের বদলে রাজপথের জন্য উপযোগী বলে তাচ্ছিল্য করেন। এ ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে প্রতিবাদের ওয়াকআউটকে ঘিরে মন্ত্রীরা মূলত রসিকতা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এসব মন্তব্যকে নিছক রাজনৈতিক রসিকতা হিসেবে দেখার উপায় নেই। কারণ এখানে প্রতিবাদের কারণে জানতে চাওয়ার চেয়ে প্রতিবাদকে হাস্যকর করে তোলার প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সংসদের সভাপতির কাছ থেকেও একই ধরনের আচরণ আরও বেশি উদ্বেগজনক। সম্প্রতি বিরোধী দলের ওয়াকআউটের সময় স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতাকে ধন্যবাদ জানান। ঘটনাটি সংসদে হাসির পরিবেশ তৈরি করে এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তা ছড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় স্পিকার বলেন, ‘আপনি কি বিরোধী দলকে ওয়াকআউট করাতে চান?’ এবং এরপরই সরকার দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে।
স্পিকার হচ্ছেন সংসদের অভিভাবক। তিনি সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের মতো রাজনৈতিক বিতর্কের একজন পক্ষ নন। তার সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা হলো সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং সংসদীয় অধিকার রক্ষা করা। বিরোধী দল ভুল করলে স্পিকার সেই ভুলের সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু বিরোধী দলের প্রতিবাদ নিয়ে হাস্যরস করা তার অবস্থান থেকে সমীচীন নয়। বিষয়টি আসলে প্রতিষ্ঠানগত সংস্কৃতির অংশ। সংসদে বিরোধী দলের প্রতিবাদকে হাসি, ব্যঙ্গ ও তাচ্ছিল্যের মাধ্যমে বিপজ্জনক একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্য নির্ধারণের শক্তিতে পরিণত হতে শুরু করে। সংখ্যাগরিষ্ঠরা মনে করতে শুরু করেন, যেহেতু তাদের ভোট বেশি, তাই বিরোধীদের প্রতিবাদ মূলত গুরুত্বহীন। রবার্ট ডালের বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের ধারণায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত। বিরোধী দল সরকারের ক্ষমতা ব্যবহারের ওপর একটি প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি। বিরোধী দলের ওয়াকআউট নিয়ে সমালোচনা করা যায়। কোনো বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার আগে সংসদীয় পদ্ধতির সব সুযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, স্থায়ী কমিটিতে কী ভূমিকা রাখা হচ্ছে, বিকল্প সংশোধনী দেওয়া হচ্ছে কি না, জনস্বার্থের বিকল্প নীতি হাজির করা হচ্ছে কি না, সেসব নিয়ে তাদের প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু কোনোভাবে বিরোধী প্রতিবাদের ভাষাকে হাস্যকর প্রমাণ করা সরকারের কাজ হতে পারে না।
বাংলাদেশে অতীতের তুলনায় বর্তমান বিরোধী জোটের কম ওয়াকআউট একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে। এই বিষয়টিকে সরকারি দলের সম্মান করা উচিত। একই সঙ্গে সেই সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে হলে বিরোধী জোটের ওয়াকআউটকেও নিয়মিত রাজনৈতিক নাটক বানানো যাবে না। সরকারকেও প্রতিটি ওয়াকআউটকে ‘হাসির ঘটনা’ বানানোর চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। সরকারি দল নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে, বিরোধী দল কেন বেরিয়ে গেল? এই আত্মসমালোচনার চর্চা গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। সরকার বিরোধী দলকে হারাবে যুক্তিতে, বিরোধী দল সরকারকে চ্যালেঞ্জ করবে তথ্য ও নীতিতে। আর স্পিকার রক্ষা করবেন দুপক্ষের কথা বলার অধিকার। এই তিনটি শর্ত পূরণ হলে ওয়াকআউট প্রতিবাদের একটি ভাষা হিসেবে টিকে থাকবে। অন্যথায় সংসদীয় গণতন্ত্র লাইনচ্যুত হবে।
লেখক : এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক
sajjadsabbir24@gmail.com