বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি অনুযায়ী, নির্বাচন সামনে এলেই শহর ও গ্রামের দৃশ্যপট বদলে যায়। দেয়ালজুড়ে পোস্টার, রাস্তাজুড়ে ব্যানার, মোড়ে মোড়ে ফেস্টুন, মাইকের শব্দ সব মিলিয়ে নির্বাচনের উপস্থিতি জনপরিসরে বেশ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। দেশে আবার নির্বাচনের মৌসুম শুরু হয়ে গেছে, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন, যা শুরু হবে ইউপি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার আইন ও বিধি সংশোধনের প্রস্তাব প্রেরণ করেছেন আইন মন্ত্রণালয়ে এবং সমন্বিত নির্বাচনী আচরণ বিধিমালাও জারি করেছে। ফলে নতুন বিধিমালা মোতাবেক আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গ্রাম-শহরের সেই চেনা দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। নির্বাচনী বিধিতে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের পাশাপাশি ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট ও বিলবোর্ড ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এতে নির্বাচনী প্রচারণার নামে দেয়াল, সরকারি স্থাপনা ও জনপরিসর দখলের প্রবণতা কমবে। পরিবেশ ও নগর-সৌন্দর্যের ওপর চাপ হ্রাস পাবে এবং নির্বাচনী ব্যয়ের দৃশ্যমান একটি অংশও নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।
কিন্তু দৃশ্যমান প্রচারণা সীমিত করার যতটা সহজ; অদৃশ্য রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া তত সহজ নয়। পোস্টার নিষিদ্ধ হলে তার স্থলে থাকবে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। প্রার্থীর অনলাইন অ্যাকাউন্টের তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও, অর্থ ব্যয় করে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে সহজেই ভোটারের কাছে সত্য-মিথ্যা প্রচারণা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। আর এখানেই নির্বাচনী নিয়ন্ত্রণের পুরনো কাঠামোর সঙ্গে নতুন বাস্তবতার সংঘাত হতে পারে। দেয়ালে লাগানো পোস্টারের উৎস ও সংখ্যা যতটা দৃশ্যমান, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের অর্থদাতা, ব্যয়ের পরিমাণ ততটা দৃশ্যমান নয়। তাই নির্বাচন কমিশন প্রচলিত ব্যয়ের হিসাবে যদি কেবল মাইক, মঞ্চ, সভা কিংবা মিছিলের মধ্যে বা রিটানিং অফিসারকে দেওয়া একটা নির্দিষ্ট আইডিতে সীমাবদ্ধ রাখে তাহলে নির্বাচনী অর্থনীতির বড় একটি অংশ হিসাবের বাইরে থেকে যাবে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে যেমন বিস্তৃত করার পাশাপাশি মিসইনফরমেশেন, ডিসইনফরমেশন, ডিপফেইক, পলিটিক্যাল বটস, মাইক্রো টার্গেটিং ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন, ডিজিটাল প্রচারণার অর্থায়ন এবং অনলাইন কনটেন্টের উৎস শনাক্ত করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কাঠামো দেশে এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তাই, পোস্টারহীন নির্বাচনকে পরিচ্ছন্ন নির্বাচন হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে প্রচারণার নতুন হিসাবটি বুঝতে হবে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো দলীয় প্রতীকের বাইরে গিয়ে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রাজনীতিতে এটি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন। ২০১৫ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চালুর মাধ্যমে স্থানীয় নির্বাচন জাতীয় দলীয় রাজনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়। এর ফলে স্থানীয় নির্বাচন অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সমস্যা, সেবা ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য ও দলীয় অবস্থান বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় যে সংকট তৈরি হয়েছিল, সেটি এই রাজনৈতিকীকরণের গভীরতার বিষয়টি প্রকটভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক পতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানীয় সরকারের পতন ঘটানোর কথা নয়। অথচ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বড় একটি অংশ আত্মগোপনে চলে যান। দেশের এই পরিস্থিতি কিন্তু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সম্পর্ক অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতাও ব্যাহত হয়, ফলে স্থানীয় সরকার তার প্রাতিষ্ঠানিক স্বাতন্ত্র্য হারায়।
এ রকম বাস্তবতায় দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়ার উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানেও সতর্কতা জরুরি। কারণ, স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও যদি তার প্রচারণা নিষিদ্ধ কোনো সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তা কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন রয়েছে কি? ব্যালটে কোনো দলের প্রতীক না থাকলেই একজন প্রার্থী রাজনৈতিকভাবে নির্দলীয় হয়ে যান না। দলীয় রাজনীতিতে প্রতিটি প্রার্থীর পেছনে কোনো রাজনৈতিক দলের স্থানীয় সংগঠন, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক শক্তি, সামাজিক প্রভাব কিংবা প্রভাবশালী কোনো গোষ্ঠীর প্রভাব থাকা এ দেশের বাস্তবতায় স্বাভাবিক। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করলে নির্বাচনের বাহ্যিক কাঠামো বদলাবে, কিন্তু ক্ষমতার অন্তর্গত সম্পর্কগুলো অপরিবর্তিত থেকে যেতে পারে। তাই নির্বাচন শুরুর আগেই গণতন্ত্রের মৌলিক শর্তাবলি অনুযায়ী যোগ্যতা, নিষেধাজ্ঞা, প্রচারণা, অর্থায়ন ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে আরও স্পষ্ট আইন প্রয়োজন। তা ছাড়া নির্বাচনী প্রচারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নির্বাচনী আচরণবিধিতে নিষিদ্ধ করা হলেও, এর ব্যবহার ঠেকাতে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। এআই দিয়ে একজন প্রার্থীর কণ্ঠস্বর নকল করে বক্তব্য তৈরি, পুরনো বক্তব্যকে নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে বিভ্রান্তিকর বার্তা খুব সহজেই ছড়ানো যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমিক বিস্তারে এসব ভুয়া কনটেন্ট অল্প সময়েই বিপুল ভোটারের কাছে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচনের কয়েক ঘণ্টা আগে ছড়ানো কোনো ভুয়া ভিডিও পরে মিথ্যা প্রমাণিত হলেও ভোটারের সিদ্ধান্তে তৈরি প্রাথমিক প্রভাব পুরোপুরি মুছে ফেলা কঠিন। যার ফলে যোগ্য ও সৎ প্রার্থী ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো এ ধরনের কনটেন্ট যদি প্রার্থীর নিজস্ব আইডি বা প্রচারমাধ্যম থেকে নয়, বরং অন্য কোনো ব্যক্তি বা বেনামি আইডি থেকে ছড়ানো হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশন কীভাবে এর উৎস শনাক্ত করবে এবং কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে? তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ঠেকাতে নির্বাচন কমিশন কতটা প্রস্তুত ও সক্ষম সেই প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার আইন ও বিধি সংশোধনের যে প্রস্তাব নির্বাচন কমিশন পাঠিয়েছে, সেখানে প্রার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি উল্লেখ না থাকাও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। বর্তমান যুগে জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব শুধু ভোটারের সঙ্গে যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাজেট, উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রশাসনিক নথি, আইন-কানুন ও ডিজিটাল সেবা সম্পর্কেও তার ন্যূনতম জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা জরুরি । নির্বাচনকে সহজলভ্য করতে গিয়ে প্রার্থীর দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষা করা হলে অযোগ্য ব্যক্তি নির্বাচিত হতে পারে। তাই একটি সুন্দর নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য নিবার্চন কমিশন কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপও বিবেচনা করতে পারে । প্রথমত, কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য একটি বাধ্যতামূলক ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করে, সেখানে প্রার্থীর ছবি, শিক্ষাগত ও পেশাগত পরিচয়, সম্পদ ও দায়ের বিবরণ, নির্বাচনী অঙ্গীকার এবং ব্যয়ের তথ্য সহজ ভাষায় প্রকাশ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, সব প্রার্থীকে সমানভাবে ভোটারের কাছে নিজেদের পরিচয় ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরার সুযোগ দিতে কমিশন-নিয়ন্ত্রিত একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে বাধ্যতামূলক ডিজিটাল ইমপ্রিন্ট চালু করা যেতে পারে। যেখানে কার পক্ষে বিজ্ঞাপন, কে অর্থ দিয়েছে এবং বিজ্ঞাপনের ব্যয় কত, তা ভোটার যেন সহজেই জানতে পারেন। চতুর্থত, এ-আই জেনারেটেড ছবি, ভিডিও ও অডিও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক লেভেল চালু করা যেতে পারে। পঞ্চমত, নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের আওতা পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেইড প্রমোশন, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, অনলাইন বিজ্ঞাপন এবং ইনফ্লুয়েন্সার ক্যাম্পেইনের ব্যয়ও এর অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। ষষ্ঠত, রাজনৈতিক সংগঠনের নিষেধাজ্ঞা ও ব্যক্তির নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার নিয়ে আগেই সুস্পষ্ট আইনগত নির্দেশনা থাকতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের জন্য নয়, সবার ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে। সপ্তমত, নির্বাচনী সময়ে ডিজিটাল মিসইনফরমেশন মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীন ফেক্ট চেকিং সংস্থার মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা থাকা দরকার। যারা অতি দ্রুত অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং ক্ষতিকর কনটেন্টের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিকার। অষ্টমত, নির্বাচনী আচরণে সরকারি সম্পদের ব্যবহার, ভোটারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা, নির্বাচনী বক্তব্য এবং রাজনৈতিক আচরণের নানা দিকও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল একটি প্রশাসনিক আয়োজন নয়। জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচিত দলীয় সরকারের অধীনে। নির্বাচন কমিশনের সামনে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রয়েছে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। নির্বাচন কমিশন তো বটেই, সরকারকেও কমিশনের নির্বাচনকালীন সহযোগী শক্তি হিসেবে নির্মোহ-কঠোর অবস্থান নিতে হবে অতীতের চিত্র সামনে রেখে। এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা, আইন প্রয়োগের সক্ষমতা এবং নতুন রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দক্ষতার ওপর। তা ছাড়া কমিশনের যাবতীয় সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে নির্বাচন কতটা অবাধ, স্বচ্ছ ও নিরপক্ষে হবে তার ওপর।
লেখক : শিক্ষাবিদ, স্থানীয় সরকার গবেষক ও সমাজ বিশ্লেষক
nazmunquadery@gmail.com