হরমুজে নতুন নৌপথ চালুর উদ্যোগ

উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত স্থবির হয়ে আছে। সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তির পথেও বড় বাধা হয়ে উঠেছে এই জলপথ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। ওয়াশিংটন প্রায়শই হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা বললেও, বরাবর তা প্রত্যাখ্যান করে ইরান জানিয়েছে, প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ তাদের কাছেই রয়েছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্যও তেহরানের দাবির পক্ষে কথা বলে। তবে এই অচলাবস্থার মধ্যেই হরমুজে নতুন নৌপথ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আজ সোমবার ওমানের রাজধানী মাসকটে বৈঠক করবেন। সেখানে ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে একটি যৌথ নৌপথ চালুর বিষয়ে চুক্তি সই হবে। ভারতের সম্প্রচারমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেকে গতকাল রবিবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, এ চুক্তির বিষয়ে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনকেও (আইএমও) জানানো হবে।

পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ‘যেসব দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে, সেসব দেশও এই বৈঠকে অংশ নেবে।’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ ও ইরানের ওপর আরোপ করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, সামরিকভাবে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে ওয়াশিংটন এখন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধের বিষয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, তার দেশ পুরোপুরি সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল নয়। তিনি বলেন, ‘সমুদ্রপথ অবশ্যই এমন কোনো বিষয় নয়, যার ওপর আমাদের টিকে থাকা নির্ভর করে। এক্ষেত্রেও তারা নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ ও হামলা বন্ধ করলে ইরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেবে।

এর আগে গত শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছিলেন, ওমানে একটি আঞ্চলিক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হবে। উপসাগরীয় অঞ্চলের ৮টি দেশ এতে অংশ নেবে। বাঘাই বলেন, বৈঠকে আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ নৌপথ নির্ধারণে ইরান ও ওমানের আলোচনার ফলাফল নিয়ে এই বৈঠক হবে। বাঘাই আরও বলেন, জলপথটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান কাজ করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধ ও সামরিক হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। এর আগে গত সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে নতুন একটি করিডর চালুর বিষয়ে ওমানের সঙ্গে চুক্তি কয়েক দিনের মধ্যেই সই হবে। রেজাই জানিয়েছিলেন, প্রস্তাবিত ওই করিডরের প্রবেশপথ ও বের হওয়ার পথ ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

বৈঠকে অংশ নেবে না বাহরাইন : হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে ওমানে আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবে না বাহরাইন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, বাহরাইন এই বৈঠকে অংশ নেবে না। উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে অবকাঠামোর ওপর হামলার কথা উল্লেখ করে মানামা জানিয়েছে, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ‘তোষণ নীতির মাধ্যমে রক্ষা করা সম্ভব নয়’। একই সঙ্গে কোনো ‘বৈষম্য, ফি বা অনুমতি’ ছাড়াই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, তারা আলোচনার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার আগে ইরানের সঙ্গে কোনো যৌথ বৈঠকেও অংশ নেওয়া সম্ভব হবে না।

আঞ্চলিক সংকটের জেরে ২০১৬ সালে সৌদি আরবের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল বাহরাইন। ২০২৩ সালে রিয়াদ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেও বাহরাইন এখনো তা করেনি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গত শনিবার আলজাজিরাকে বলেন, ‘এই বৈঠকটি ইরানের সদিচ্ছারই একটি নিদর্শন। কারণ আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি যে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা এই অঞ্চলের দেশগুলোকেই নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি আরও জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে ইরান-ওমানের আলোচনার ফল সম্পর্কে তেহরান আঞ্চলিক দেশগুলোকে অবহিত করবে। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, এ বৈঠক থেকে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হবে কি না তা নিশ্চিত নয়।