বিশ্বমঞ্চে লড়বে বাংলাদেশের স্বর্ণজয়ী ‘মন তরঙ্গ’

প্রযুক্তির সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মেলবন্ধন ঘটিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশের তরুণদের উদ্যোগ ‘মনতরঙ্গ’। উদ্ভাবনী এই সমাধানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘ফিবোনাচি ইন্টারন্যাশনাল রোবট অ্যান্ড স্টেম অলিম্পিয়াড ২০২৬ ন্যাশনাল রাউন্ড’-এর হেলথ টেক অন্ট্রাপ্রেনারশিপ চ্যালেঞ্জে স্বর্ণপদক জিতেছে দলটি। জাতীয় পর্যায়ের এই সাফল্যের হাত ধরেই এবার ইতালির রোমে ‘ফিবোনাচি গ্লোবাল ফাইনাল রাউন্ড ২০২৬’-এ লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছে তারা।

যেভাবে শুরু মনতরঙ্গের গল্প

কম বয়সে হতাশা বা মানসিক চাপ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নিজের জীবন থেকেই উপলব্ধি করেছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী রিদম মুন্সী। শিক্ষার্থীদের মনের সুরক্ষায় কিছু একটা করার ভাবনা তার গত বছর থেকেই ছিল। ভাবনাটি তিনি ভাগাভাগি করেছিলেন অগ্রজ সানজিদা আশেকিনের সঙ্গে। এ বছর বিএএফ শাহীন কলেজের এক বন্ধুর আত্মহত্যার ঘটনা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। প্রবলভাবে তাগিদ অনুভব করেন কিছু একটা করার। তখনই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে উদ্ভাবনী কোনো সমাধান তৈরির কথা মাথায় আসে তার। সমমনাদের নিয়ে গড়ে তোলেন মানসিক স্বাস্থ্যসহায়ক ওয়েবসাইট ‘মনতরঙ্গ’। রিদম নিজেই এই উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)।

রিদমের এই ভাবনার সঙ্গে একে একে যুক্ত হন বিএএফ শাহীন কলেজ, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ, ইউনিভার্সিটি অব সাইবারজায়া (মালয়েশিয়া), ঢাকা সিটি কলেজ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি বিজ্ঞান কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। মূলত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই গড়ে ওঠে মনতরঙ্গ। গত ১০ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ওয়েবসাইটটি। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ক্যাম্পাসে মনতরঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ ও এআই চ্যাটবট

পরিকল্পনা অনুযায়ী ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ চললেও মূল চ্যালেঞ্জ ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিস্টেম তৈরি করা। প্রযুক্তিগত দিকের দায়িত্বে থাকা ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী অর্ণব দত্ত জানান, চারজন শিক্ষার্থী দলগতভাবে ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজ করেছেন। তাদের তৈরি বিশেষায়িত এআই চ্যাটবটের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টাই বার্তা আদান-প্রদান করা যায়, এমনকি অডিও আলাপে মন খুলে বলা যায় নিজের কথাও। এই চ্যাটবট ব্যবহারকারীকে ইতিবাচক জবাব ও মনের যত্নের পরামর্শ দেয়। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্টের লিংকও সরবরাহ করে। ওয়েবসাইটটির সাইবার নিরাপত্তায় কাজ করছেন ইউনিভার্সিটি অব সাইবার জায়ার শিক্ষার্থী শাহরিয়ার শানাজ।

শুধু এআই নয়, রয়েছে অনেক কিছু

মনতরঙ্গের সেবা শুধু এআইতেই সীমাবদ্ধ নয়। উদ্যোগটির মানবসম্পদের দায়িত্বে থাকা গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী সামিহা মালিক জানান, ওয়েবসাইটে রয়েছে মুড ট্র্যাকার, সেলফ কেয়ার ও মনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যায়াম চর্চার সুযোগ। রয়েছে টাইমার চালু করে ‘শিথিলায়ন’ বা রিলাক্সেশনের সুবিধা। পরিচয় গোপন রেখে মনের কথা লেখারও সুযোগ রয়েছে এখানে।

ওয়েবসাইটের ‘সেলফ হেল্প’ অংশে রয়েছে সমুদ্র, বৃষ্টি আর বাতাসের শব্দের মতো চমৎকার সব আবহ, যা মনকে শান্ত করতে সাহায্য করে। ওয়েবসাইটে বিনামূল্যে একটি প্রোফাইল খুলেই এসব সেবা পাওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞদের অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে সেবা নিতে অবশ্য নির্দিষ্ট ফি দিতে হয়। তবে নিতান্তই অসুবিধায় থাকা শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার কথা জানান উদ্যোগটির চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) সানজিদা আশেকিন। তিনি বলেন, ‘এআই চ্যাটবট কখনোই একজন বিশেষজ্ঞের বিকল্প নয়; বরং না বলা কথা ভাগ করে নেওয়ার মতো এক বন্ধু হয়ে উঠতেই এআইকে কাজে লাগিয়েছি আমরা।’

লক্ষ্য এবার রোমের বিশ্বমঞ্চ

মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য করার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করা মনতরঙ্গের সামনে এখন নতুন গন্তব্য ইতালির রোম। জাতীয় পর্যায়ের স্বর্ণপদক তাদের এই দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টারই স্বীকৃতি। আগামী দিনে গ্লোবাল ফাইনালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ উদ্ভাবকদের সঙ্গে লড়বে তারা।

বন্ধুকে হারানোর শোক আর তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভেবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ দেশের গ-ি পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে। মনতরঙ্গের এই আন্তর্জাতিক যাত্রা বাংলাদেশের তরুণদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা বিশ্বদরবারে তুলে ধরার এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।