গাছের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব সেই ছোটবেলা থেকে। টিফিনের টাকা জমিয়ে গাছ কিনে লাগাতেন। এ পর্যন্ত গাছ লাগানো ও চারা বিতরণ মিলিয়ে তিনি ১০ হাজারের বেশি গাছের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার চারা তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিতরণ করেছেন। বৃক্ষপ্রেমী এই মানুষটির নাম হাবিবুর রহমান। নোয়াখালী কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে তৃতীয় বর্ষে অনার্স পড়ছেন। লিখেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
২০১৬ সালে অষ্টম শ্রেণি থেকে হাবিবুরের গাছ লাগানোর শুরু। বাসা থেকে টিফিনের যে টাকা পেতেন, সেটা তিনি জমিয়ে রাখতেন। পরে ওই টাকায় গাছ কিনে সড়কের পাশে লাগাতেন। গাছপালা, পরিবেশ, প্রকৃতি, পাখি তার খুব ভালো লাগে। এক সময় দেখলেন, প্রকৃতি থেকে এসব কমে যাচ্ছে। তখন তিনি আরও জোরালোভাবে গাছ লাগানো শুরু করেন। তার ভাষায়, স্কুলজীবনে গ্রাম থেকে শহরে পড়াশোনা করতে গিয়ে ইট-পাথরের কোলাহল, নদী-খাল ও গাছপালাহীন পরিবেশ আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তখন থেকে গাছপালা ও পরিবেশের অভাব বুঝতে পারি, তখন বুঝতে পারি আমাদের চারপাশের গাছপালা ছাড়া কোনো মানুষের বেড়ে ওঠা সুষ্ঠু হতে পারে না, ভাবতে লাগলাম আমাদের এই চারপাশের পরিবেশ-প্রকৃতি যদি হারিয়ে যায় আমাদের বেঁচে থাকার আনন্দ বৃথা যাবে, সেই উপলব্ধি থেকেই স্কুলজীবনে নিজের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে রাস্তার পাশে ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ শুরু করি।
হাবিবুরের বাড়ি নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার লুধুয়া গ্রামে। মূলত গাছ লাগানোর জন্য তিনি বর্ষা মৌসুম বেছে নেন। অন্যান্য সময় গাছের পরিচর্যা করেন। হাবিবুর দেশীয় প্রজাতির ফলদ ও ঔষধি গাছ আম, কাঁঠাল, কালোজাম, আমলকী, নিম, হরীতকী, বহেড়া, চালতা, জলপাই, বেল প্রভৃতি রোপণ করেন। এসব গাছ একদিকে মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে, অন্যদিকে পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যেরও জোগান দেয়। তবে রাস্তার পাশে তিনি মূলত তাল ও খেজুরগাছ রোপণ করেন। কারণ এসব গাছের ডালপালা তুলনামূলক কম ছড়ায়। ফলে গাছের ছায়া পড়ে ফসলি জমির ক্ষতি হওয়ার সুযোগ কম থাকে।
হাবিবুর যেসব জায়গায় গাছ লাগিয়েছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নোয়াখালী, সেনবাগ উপজেলার ২ নম্বর কেশারপাড়া ইউনিয়নের ২ কিলোমিটার এলজিইডির সড়ক, চট্টগ্রাম মিরসরাই উপজেলার তালবাড়িয়া পাহাড়ি অঞ্চল, মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নে সরকারি খাস জায়গা, নোয়াখালী উপকূলীয় অঞ্চল প্রভৃতি। তিনি জানান, নোয়াখালী উপকূলীয় অঞ্চলের নতুন চরে গেওয়া, কেওড়া, গড়ান, বাইন, সুন্দরী রোপণ করেছেন। গাছ লাগানোর পাশাপাশি হাবিবুর ৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিশুদের মধ্যে প্রতি বছর চারা বিতরণ করেন। গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করেন। আবার কৃষকদের নিয়ে বসে অতিরিক্ত মাত্রায় সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেন। এলাকার বন্যপ্রাণী শিকার রোধেও তিনি কাজ করেন।
গাছ লাগানো যতটা সহজ, সেই গাছকে যত্ন করে বড় করে তোলা ততটা সহজ নয়। হাবিবুরের কাছে প্রতিটি গাছ যেন নিজের হাতে গড়ে তোলা একটি সন্তানের মতো। তাই গাছ লাগিয়েই তার দায়িত্ব শেষ হয় না; নিয়মিত পরিচর্যা করেন, খোঁজ নেন, গাছগুলো ঠিকমতো বেড়ে উঠছে কিনা, সেদিকেও নজর রাখেন।
তবু সব গাছকে রক্ষা করতে পারেননি তিনি। একবার রাস্তার পাশে বেশ কিছু তালগাছ লাগিয়েছিলেন। নিজের হাতে মাটি খুঁড়ে, চারা রোপণ করে, সেগুলো বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু পরে কিছু মানুষ সেই গাছগুলো নষ্ট করে ফেলে। ছোট্ট চারাগাছগুলোর এমন পরিণতি তাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। সেই ঘটনার কথা মনে পড়লে আজও তার মন খারাপ হয়ে যায়। গাছগুলো শুধু নষ্ট হয়নি নষ্ট হয়েছিল তার সময়, শ্রম আর ভালোবাসার একটি অংশ।
শুধু তাই নয়, অনেক সময় গাছ লাগাতে গেলে মানুষ বাধা দেয়। শুরুর দিকে অনেকে বলত, ‘গাছ লাগিয়ে তোমার লাভ কী? তুমি একটা পাগল!’ এমন নানা কটু কথাও শুনতে হয়েছে তাকে। কিন্তু এসব বাধা ও কটু কথা হাবিবুরের পথ রোধ করতে পারেনি। কারণ তার মধ্যে রয়েছে গাছের প্রতি পাহাড়সম ভালোবাসা।
হাবিবুর জানান, এ পর্যন্ত গাছ লাগানো ও চারা বিতরণ মিলিয়ে তিনি ১০ হাজারের বেশি গাছের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার চারা তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিতরণ করেছেন। তার হিসাব অনুযায়ী, তিনি নিজে লাগানো গাছগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো টিকে আছে। ২ নম্বর কেশারপাড়-ছাতারপাইয়া রোডের খালের বাঁধে গেলে তার লাগানো অনেক বনজ গাছ চোখে পড়বে। আবার লুধুয়া-লেমুয়া সড়কেও দেখা যাবে তার লাগানো তাল ও খেজুরগাছ।
এলাকাবাসী হাবিবুরের এই উদ্যোগকে ভালো চোখে দেখেন। সালেহ আহমেদ তাদেরই একজন। তিনি বলেন, ‘হাবিবুর নিজের পকেটের টাকা দিয়ে গাছ কিনে যে সবুজায়নের চেষ্টা করছেন, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। তার পাশে আমরা আছি।’ ২ নম্বর কেশারপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল হক জানান, হাবিবুর অনেক দিন ধরেই গাছ লাগাচ্ছেন। তার এই কাজ প্রশংসাযোগ্য।
গাছ লাগাতে এবং পরিচর্যার জন্য অর্থের প্রয়োজন। হাবিবুর সারা বছর অর্থ সঞ্চয় করেন। পরে তা গাছের জন্য খরচ করেন। বাবা ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তিনি কোনো রকম সাহায্য নেন না। আর্থিক সাহায্য না নিলেও বন্ধুবান্ধব ও এলাকার মানুষের কাছ থেকে কায়িক সহযোগিতা নেন হাবিবুর। তারা গাছ লাগানোর কাজে তাকে সহযোগিতা করেন। বাবা-মা ও দুই বোনকে নিয়ে হাবিবুরের পরিবার। পরিবারের সদস্যরাও তার গাছ লাগানোর কাজকে সার্বিকভাবে সমর্থন করেন।
গাছ লাগানো নিয়ে অনেক দুঃখ-কষ্ট থাকলেও ভালো লাগাও আছে হাবিবুরের। হাবিবুর জানান, তার রোপণ করা কিছু গাছ থেকে যখন মানুষ ও পাখিরা ফল খায়, তখন তার খুব ভালো লাগে। ভবিষ্যতে হাবিবুর তার এই একক ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে বৃহৎ আন্দোলনে রূপ দিতে চান এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নিতে চান। তিনি চান, তার এই গাছ লাগানোর উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ুক সর্বত্র। মানুষ গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলো টিকিয়ে রাখতেও এগিয়ে আসুক।