প্রত্যেকের জীবনে প্রথম উপার্জন একটা বিশেষ ঘটনা। আর বর্তমান এই নব্য উদারপন্থি অর্থব্যবস্থায় প্রথম চাকরি বা কাজ পাওয়াটা নিজের পায়ে দাঁড়ানো বা স্বাবলম্বী হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু আমার জীবনে চাকরি নিয়ে কখনো তেমন আগ্রহ ছিল না। আমার বন্ধুরা যখন টিউশনি শুরু করেছিল, তখনও কাউকে বাসায় গিয়ে পড়ানোটা আমার কাছে দুঃসাধ্য ব্যাপার মনে হতো।
ভাগ্যক্রমে সেই কাজটিই আমাকে করতে হয়েছিল। ঘটনাটা তিন বছর আগের, ২০২২ সালের আগস্টের মধ্যে আমার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়। ঘরে বসে বসে আমি তখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ঘুরতে যাওয়ার খুব ইচ্ছে জেগেছিল অথচ পকেটে কানাকড়িও নেই। নিত্যদিনের খরচ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। সত্যিই একটা কাজের প্রয়োজন ছিল।
এমন অবস্থায় অক্টোবরের শেষের দিকে ছোটবেলার এক বন্ধু কল দিয়ে বলল, ‘তুই কি সন্ধ্যায় ফ্রি থাকিস?’ তার পরীক্ষা শুরু হওয়ায় সে তার ছাত্রকে অঙ্ক ও ইংরেজি পড়ানোর জন্য আমাকে বলল। আমি রাজি হলাম।
নভেম্বরের শুরুতে প্রথম কর্মক্ষেত্রে যোগ দিলাম। ছাত্রের মা জানালেন, সপ্তাহে চার দিন পড়ানোর জন্য আমাকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। এত টাকা! মনে মনে ভাবলাম, এই পুঁচকে বাচ্চাকে কী এমন রকেট সায়েন্স শেখাব যে আমাকে ১০ হাজার দেবে!
প্রথম দিন বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, কারণ এর আগে কাউকে পড়াইনি। কিন্তু কয়েকটি ক্লাসের পর বুঝলাম, ছেলেটা অত্যন্ত মেধাবী। সমস্যা তার মেধায় নয়; আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তাকে সংকুচিত করে রেখেছে। ওকে যা দেওয়া হয়, সে তা-ই করে। এর বাইরে ভাবতে পারে না। ঠিক পারে না বলা উচিত না, ভাবতে ভয় পায়। ভাবলাম যতটুকু সময় আছে তার ভেতরে ওর ভয়টাকে ভাঙতে হবে।
আমি তাকে নানা বিষয়ে অবলীলায় প্রশ্ন করার সুযোগ দিলাম এবং সব প্রশ্ন গুরুত্ব সহকারে নেওয়া শুরু করলাম। এক মাসের মধ্যে দেখলাম, তার জগৎদর্শন ও চিন্তাচেতনা আগের চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফলেও অঙ্ক ও ইংরেজিতে সে অনেক ভালো করল।
ছাত্রের ভালো ফলাফলের কৃতিত্ব তার নিজের এবং আমার বন্ধুর। আমার কৃতিত্ব শুধু এটুকু, আমি তাকে সেই বন্দি খাঁচা থেকে কিছুটা বের করে আনতে পেরেছিলাম। নিজেকে একজন শিক্ষক হিসেবে ধন্য মনে হলো। আমার প্রথম চাকরি সার্থক হলো।
মাসের শেষে ছাত্রের মা আমাকে একটি খাম দিলেন। বুঝলাম, এটাই আমার প্রথম বেতন। কিন্তু ততদিনে আমার কাছে সেই অর্থ আর আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কারণ, সেই এক মাসে আমি টাকার চেয়েও মূল্যবান কিছু পেয়েছিলাম, নিজেকে একজন শিক্ষক হিসেবে আবিষ্কার করার সুযোগ।