ভেনিসে সৌরভ ছড়ালেন রুবাইয়াত

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন। বাংলাদেশি নারী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে একমাত্র তিনিই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জ্যোতি ছড়িয়ে আসছেন। মেহেরজান, আন্ডার কনস্ট্রাকশন এবং শিমুর পর নির্মাণ করেছেন চতুর্থ সিনেমা ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। শুরু থেকেই তার সিনেমায় তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণির নারীর জীবনকথা। আর এবার নারীবাদী গল্পে আলো ছড়ালেন এবারের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে। প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সাড়া পেয়েছেন বলেও জানান তিনি। লিখেছেন জাহাঙ্গীর বিপ্লব

উৎসাহ-উদ্দীপনায় পর্দা নামল ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের। এবারের আসরের ‘গোল্ডেন লায়ন’ জিতেছে ডেনিশ নির্মাতা মে এল তুখির ‘ওম্যান আননোন’। একই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রী নির্বাচিত হয়েছে ম্যাথিল্ড আরসেল। আর ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’-এ অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি পেয়েছেন হলিউড তারকা জন মালকোভিচ। এই  আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল হলিউড তারকা জর্জ ক্লুনিকে আজীবন সম্মাননা ‘গোল্ডেন লায়ন’ প্রদান। অভিনয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।

তবে এবারের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবটির প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে জায়গা করে নিয়েছে। নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নির্বাচিত হয়েছে ‘ওরিজন্তি’ প্রতিযোগিতা বিভাগে। শুধু তাই নয়, ছক ভাঙা গল্পের এই সিনেমাটির জন্য স্বাধীন চলচ্চিত্র সমালোচকদের প্যানেল থেকে সেরা পরিচালকের পুরস্কার ‘প্রেমিও বিসাতো দ’ওরো’ জিতেছেন বাংলাদেশের নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন। সৌন্দর্য বলতে সমাজ কী বোঝে সেই ধারণাকে প্রশ্ন করাই ছিল তার অন্যতম উদ্দেশ্য। রূপচর্চার আড়ালে থাকা যন্ত্রণা এবং পার্লারকেন্দ্রিক সৌন্দর্যচর্চার মাধ্যমে কীভাবে একটি মেয়েকে সমাজের নির্ধারিত ছাঁচে ‘নারী’ হিসেবে তৈরি করা হয়, সেটিও সিনেমায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি।

সমকালীন ঢাকাকে পটভূমি করে নির্মিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর গল্প জাইনিনকে ঘিরে। এক তরুণী, যিনি বিয়ের প্রস্তুতি ও সৌন্দর্য চর্চার নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যেতে গিয়ে আবিষ্কার করেন, তার শরীরই হয়ে উঠছে এক অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের ক্ষেত্র। নারীবাদী ফোক হরর, বডি হরর ও অতিপ্রাকৃত উপাদানের মিশেলে নির্মিত চলচ্চিত্রটি অনুসন্ধান করে কীভাবে নারীর শরীর পারিবারিক প্রত্যাশা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও আকাক্সক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়। পুরস্কারপ্রাপ্তি প্রসঙ্গে রুবাইয়াত হোসাইন বলেন, নারীরা কীভাবে নিজেদের শরীরকে ধারণ করতে, নিয়ন্ত্রণ করতে এবং কখনো কখনো নিজেদের শরীরকেই ভয় করতে শেখে, সেই ভাবনা থেকে। ভেনিসের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম ক্রিটিকসদের কাছ থেকে এই স্বীকৃতি পাওয়া আমার জন্য গভীরভাবে অর্থবহ। আমি চাই, এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শক বাংলাদেশকে শুধু তার সামাজিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে নয়, বরং তার কল্পনা, লোককথা, অন্ধকার এবং সৌন্দর্যের মধ্য দিয়েও আবিষ্কার করুক।’

এই নির্মাতা জানালেন, ‘সত্যি বলতে কোনো সাফল্য বা পুরস্কার অর্জনের জন্য আমি সিনেমা নির্মাণ করি না। আমি নির্মাণ করি নিজের জন্যই। তাছাড়া নির্মাণের সময় উৎসব বা পুরস্কারের কথা মাথায় থাকে না; ভালোবাসার জায়গা থেকেই চলচ্চিত্র বানানো হয়। সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে জুরি পর্যন্ত সিনেমাটি যে মাত্রায় গ্রহণ করেছেন, সেটিকে প্রত্যাশার চেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষিণ এশিয়ার সিনেমা বলতে অনেক সময় দারিদ্র্য, বিষাদ কিংবা দুর্দশার গল্পকেই সামনে আনা হয়। কিন্তু ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’র মাধ্যমে পরিচিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে এক উচ্চবিত্ত পরিবারের গল্প বলতে চেয়েছি। প্রচলিত ছকের বাইরে এমন একটি গল্প নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক উৎসবে স্বীকৃতি পাওয়া সিনেমাটির সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করছি আমি।’

দর্শকদের প্রতিক্রিয়াতেও সন্তুষ্টির কথা উল্লেখ করে রুবাইয়াত জানান, শেষ দৃশ্য দেখে অনেক দর্শক কেঁদেছেন। বিভিন্ন জায়গায় দর্শক সিনেমাটি দেখে তাদের ভালো লাগার কথাও জানিয়েছেন। বাংলাদেশের সিনেমা এভাবে আন্তর্জাতিক পরিসরে মানুষের মন জয় করতে পারাকে নিজের জন্য বিশেষ অনুভূতি হিসেবে দেখছেন তিনি। ভেনিসের পর সিনেমাটি নিয়ে আবারও আন্তর্জাতিক সফরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন রুবাইয়াত। খুব শিগগিরই তিনি উত্তর আমেরিকার টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে যাবেন। এরপর তার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে বিএফআই লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবেও।

উৎসবের শুরু থেকে শেষ অবধি উপস্থিত ছিলেন রুবাইয়াত। ২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয় ৬ সেপ্টেম্বর। পরিচালক বলেন, প্রিমিয়ারের দিন এত ব্যস্ত ছিলাম বলা চলে এক ধরনের ঘোরের মধ্যেই ছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, ওই দিনটিকে আরও একটু উপভোগ করা উচিত ছিল। উৎসবে যাওয়ার সময় থেকেই ইচ্ছা ছিল পুরো দল এক পরিবারের মতো একসঙ্গে উদযাপন করব। সে কারণেই রেড কার্পেটে সাউন্ড এডিটর থেকে অভিনয়শিল্পী সবার উপস্থিতি নিশ্চিত করেছিলাম। সব মিলিয়ে এবারের ভেনিস উৎসব আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’