গভীর সমুদ্রবন্দরে ভয় দেখাচ্ছে কাদামাটি

কাদামাটি ভাবাচ্ছে মহেশখালীর মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে। ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ কৃত্রিম চ্যানেলের প্রায় দুই কিলোমিটারে জমা হচ্ছে এই কাদামাটি। আর এক কিলোমিটারে জমছে বালু। কাদামাটি ও বালু জমে যাওয়ার কারণে এই তিন কিলোমিটারের মধ্যেই বিঘ্নিত হচ্ছে জাহাজের স্বাভাবিক চলাচল। কাদামাটি জমার কারণে চ্যানেলে (জাহাজ চলাচলের পথ) জাহাজের ড্রাফট (জাহাজের তলদেশে পানির গভীরতা) কমিয়ে আনা হয়েছিল গত ডিসেম্বরে। ১০০ কোটি টাকা খরচ করে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে গভীরতা বাড়িয়ে আবারও ড্রাফট পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে বলে দাবি করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

গত ৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নোটিস টু মেরিনার শীর্ষক বিজ্ঞপ্তিতে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের কয়লা জেটিতে ২৩০ মিটার দীর্ঘ ও ১২ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের ভিড়তে পারবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে গত বছরের গত ২ ডিসেম্বর মাতারবাড়ি চ্যানেলে পলি জমায় নিরাপদ নৌচলাচলের জন্য অনুমোদিত জাহাজের ড্রাফট ১১ দশমিক ৫ মিটারে আনা হয়েছিল। গত জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ড্রেজিং শেষে তা আবারও পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হলো।

এর আগে ২০২৩ সালের ২৬ এপ্রিল ১৩ মিটার ড্রাফটের কয়লাবাহী জাহাজ ভেড়ানোর মাধ্যমে গভীর সমুদ্রবন্দরের যুগে প্রবেশ করে এ বন্দর। যদিও তখনো ১২ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ চলাচলের অনুমোদনের ঘোষণা ছিল। এর পর থেকে প্রতিটি জাহাজে গড়ে প্রায় ৬৪ হাজার টন কয়লা নিয়ে মাসে দুটি থেকে চারটি করে জাহাজ ভিড়ছে মাতারবাড়িতে। এ পর্যন্ত ভিড়েছে ২২৩টি জাহাজ, এগুলোর মধ্যে কয়লাবাহী জাহাজ ছিল ১০৯টি। 

কোথায় বেশি পলি জমে : কৃত্রিম এই চ্যানেলের নাব্য ফিরিয়ে আনতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ডিপিএম মেথডে নারায়ণগঞ্জের ডক ইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসকে ড্রেজিংয়ের দায়িত্ব দেয়। নারায়ণগঞ্জ ডক ইয়ার্ড এটি ড্রেজিংয়ের দায়িত্ব দেয় চায়নার সিসিইসিসি কোম্পানিকে। এই প্রতিষ্ঠানটি গত জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ড্রেজিং করে চ্যানেলের নাব্য আগের পর্যায়ে নিয়ে আসে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চ্যানেলের প্রথম আট কিলোমিটার অংশে পলি জমার হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম। সাগরের দিক থেকে জেটির দিকে আসতে নবম কিলোমিটারের অংশে বালু জমার হার বেশি। ১০ ও ১১তম কিলোমিটারে পলি তথা কাদামাটি জমার হার অনেক বেশি। আর এই কাদামাটির কারণেই এই অংশে চ্যানেলের গভীরতা কমে গিয়েছিল। তবে ১১তম কিলোমিটারের পর থেকে জেটি পর্যন্ত এলাকাটিতে বালু বা পলি জমার হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম। আর এ কারণেই জেটিতে জাহাজ ভিড়লে ভাটা থাকলেও জাহাজের তলা মাটিতে আটকায় না।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ড্রেজার জাহাজ ‘খনক’ মাতারবাড়ি চ্যানেলে মেইনটেনেন্স ড্রেজিংয়ের কাজ করে। খনকের সিনিয়র ড্রেজার মাস্টার লে. কমান্ডার আশিক মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘ব্রেক ওয়াটারের (চ্যানেলের উভয় পাশে নির্মিত কৃত্রিম বাঁধ) বাইরের অংশ থেকে শুরু করে ভেতরের অংশ পর্যন্ত এলাকাটিতে তুলনামূলকভাবে বেশি পলি ছিল। এর মধ্যে সাগরের দিকে ছিল বালু এবং ভেতরের দিকে (জেটির দিকে) ছিল পলির আধিক্য।’ 

৯ থেকে ১১ কিলোমিটারের মধ্যে পলি জমার হার বেশি কেন : মেরিন সেক্টরে অভিজ্ঞ চট্টগ্রাম বন্দরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাগর থেকে জাহাজ যখন চ্যানেল দিয়ে জেটিতে প্রবেশ করে তখন অনেক বালু ও পলি নিয়ে আসে। আসার সময় প্রথম আট কিলোমিটারের পর একটি বাঁক রয়েছে, এই বাঁকে এসে পানির গতি কমে গিয়ে বালু জমা হতে থাকে চ্যানেলের তলদেশে। বালু জমার পর ঘোলা পানিতে মিশ্রিত থাকা পলিগুলো (কাদামাটি) জমা হয় ১০ম ও ১১তম কিলোমিটারের মধ্যবর্তী এলাকায়। আর পর পরই চ্যানেলের পানি স্বচ্ছ দেখা যায় এবং জেটি পর্যন্ত স্বচ্ছ পানি থাকে। পানির গতি কম থাকায় পানিতে থাকা পলি আর জেটি পর্যন্ত যায় না।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিনার্স অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম জানান, ‘উজান থেকে নদীপথে আসা পলিগুলো সাগরের পানির সঙ্গে ভাসমান থাকে। এসব ভাসমান পলি মাতারবাড়ি চ্যানেল দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু এই চ্যানেলের উজান থেকে কোনো পানি আসার সুযোগ না থাকায় চ্যানেলে প্রবেশকৃত পলিগুলো আর বের হতে পারে না। ফলে ওখানেই জমা হতে থাকে।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম জানান, ‘সাগর থেকে পলি মিশ্রিত পানি চ্যানেলে প্রবেশের পর ব্রেক ওয়াটার পর্যন্ত আসার পর গতি কমে যায়। গতি কমে গেলে বালু ভারী পদার্থ বলে তা আগে তলদেশে জমা হয় এবং এরপরই পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় থাকা কাদামাটিগুলো জমা হয়। জেটি পর্যন্ত যাওয়ার গতি কম থাকে বলে সেখান পর্যন্ত পলি জমার হার অনেক কম থাকে।’

খরচ হয়েছে ১০০ কোটি টাকা : চ্যানেলের মধ্যবর্তী এলাকার বালু ও পলি উত্তোলনে ১০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু এই টাকা কোন খাত থেকে ব্যয় হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, ‘যেহেতু মাতারবাড়িতে জাহাজ ভিড়ে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের। জাহাজ চলাচলের সুবিধার্থে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ড্রেজিং করে দেওয়া হলেও এর সুবিধাভোগী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তাই আমরা এই খাতে খরচ হওয়া ১০০ কোটি টাকার জোগান কে দেবে তা জানতে মন্ত্রণালয়ের কাছে নির্দেশনা চেয়েছি।’

নিয়মিত ড্রেজিং ছাড়া গতি নেই : ২০২৩ সালের পর থেকে এই চ্যানেল দিয়ে কয়লাবাহী জাহাজ প্রবেশ করছে। দুই বছরের মাথায় চ্যানেলের বিভিন্ন অংশে পলি জমে গভীরতা কমে যায়। ড্রেজিং করে আবারও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব জানান, ‘এই চ্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের বিকল্প নেই। নিয়মিত ড্রেজিং না করলে পলি জমার হার বাড়বে।’

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়িতে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নেয় সরকার। জাইকার অর্থায়নে সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে মাতারবাড়ি পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, ১৬ মিটার ড্রাফট এবং ২৫০ মিটার চওড়া চ্যানেল নির্মাণ হয় বিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায়। কয়লা বিদ্যুতের চ্যানেলের ওপর ভিত্তি করে মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলা যায় উল্লেখ করে জাইকা একটি প্রস্তাবনা দেয়। সেই প্রস্তাবনা ও পরবর্তীতে সমীক্ষার পর ‘মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়। আর এরই আওতায় চ্যানেলের চওড়া ১০০ মিটার বাড়ানোর পাশাপাশি গভীরতাও ১৮ মিটারে উন্নীত করার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। এজন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি ১৬ লাখ ১৩ হাজার টাকার বাজেট একনেক থেকে অনুমোদন করে। এর মধ্যে জাইকার ঋণ ১২ হাজার ৮৯২ কোটি ৭৬ লাখ ৫ হাজার টাকা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (নিজস্ব তহবিল) ২ হাজার ২১৩ কোটি ২৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ সরকারের ২ হাজার ৬৭১ কোটি ১৫ লাখ ১৪ হাজার টাকা।

২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন তা ২০২৯ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। মাতারবাড়িতে ৩৫০ মিটার দীর্ঘ ও ১৬ মিটার ড্রাফটের (পানির গভীরতা) জাহাজ ভিড়তে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ২০০ মিটার দীর্ঘ ও ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে। মাতারবাড়ি চালু হলে এর সঙ্গে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের সঙ্গে নেটওয়ার্ক আরও বাড়বে। ফলে গভীর সমুদ্রবন্দরের অভাব পূরণ করবে মাতারবাড়ি বন্দর।