বিলুপ্তির পথে রশিশিল্প শেষ ভরসা ভিডিপি

একসময় গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নারিকেলের ছোবড়া থেকে রশি তৈরির কুটিরশিল্প। সময়ের সঙ্গে নারিকেলের উৎপাদন কমে যাওয়া, ছোবড়ার সংকট ও সস্তা প্লাস্টিকের রশির দাপটে যাশোরের মনিরামপুরে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। থেমে গেছে বহু বছরের কাঠের চরকা। তবে শিল্পটির শেষ চিহ্নটুকু ধরে রেখেছেন স্থানীয় আনসার-ভিডিপির সদস্যরা। দলবদ্ধভাবে হাতে তৈরি চরকায় নারিকেলের ছোবড়া থেকে রশি তৈরি করে নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তারা।

জানা গেছে, মনিরামপুর উপজেলায় শত বছর ধরে কাঠের তৈরি চরকার সাহায্যে কাতা বা নারিকেলের রশি তৈরি করা হতো। ভবদহের স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে এই শিল্পটির বিস্তার লাভ করেছিল। বিশেষ করে কৃষকের জমি যখন পানির নিচে থাকে, তখন জীবিন-জীবিকার তাগিদে প্রায় গ্রামেই নারী-পুরুষেরা মিলে নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে রশি  ‘কাতরা’ বা ‘কাতা’ তৈরি করত।

একদিকে স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও সাম্প্রতিক আবহাওয়ার বিবর্তনে সাদা মাছির প্রাদুর্ভাব তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে এ উপজেলায় নারিকেলের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। স্থানীয়ভাবে নারিকেলের কাঁচা ছোবড়া সংগ্রহের খরচ ও পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় প্রান্তিক কারিগরদের পক্ষে এখন রশি তৈরি করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নারিকেল গাছে এখন আর তেমন নারিকেল ধরছে না। তাই আমরা কাতা-কাটা বাদ দিয়েছি।’

আড়শিংগাড়ি গ্রামের হালিমা বলেন, ‘এখন আর নাইরকেলের খুলা পাওয়া যায় না। তাই এ কাজ অনেকে ছাইড়ে দেছে।’

নেহালপুর ইউনিয়নের রশিদুল ইসলাম বলেন, ‘নারিকেল গাছ জলাবদ্ধতায় বেশি দিন বাঁচে না। আমাদেরও কাতাকল ছিল, এখন নেই। কারণ খুলা পাওয়া যায় না। নারিকেল গাছের পাতায় সাদা মাছি বসে পাতার রস চুষে খায়। এতে পাতার নিচে একপ্রকার কালো আবরণ পড়ে। এ কারণে গাছের ফল ধরার ক্ষমতা কমে গেছে। তাই এই এলাকায় নারিকেলের ছোবড়ার অভাব দেখা দিয়েছে।’

অর্থনীতিবিদদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নারিকেলের ছোবড়া থেকে পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কোকোপিট, কয়্যার ফাইবার ও বিভিন্ন হস্তশিল্প পণ্য তৈরির মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কোটি টাকা রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

আনসার-ভিডিপি সদস্য রবিউল ইসলাম বলেন, ‘নিজেদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য কাতা-শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। আমরা দলবদ্ধভাবে এই রশি তৈরি করি। ভালো মানের রশির কেজিপ্রতি বাজার দর ৫০০-৬০০ টাকা। তবে গ্রামগঞ্জে এখন নারিকেলের ছোবড়া পাওয়া যায় না। এ কারণে এই শিল্প এখন আর চোখে পড়ে না। তবে আড়শিংগাড়ি গ্রামের বেশ কিছু পরিবারে এখনো কাতাকল আছে, কিন্তু এই উপজেলায় এই কুটিরশিল্প নেই বললেই চলে। তারপরও রশিশিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমরা কাজ করছি।’