সার সিন্ডিকেটের বলি কৃষক

জামালপুরে আমন আবাদ ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। ভালো ফলনের আশায় কৃষকরা দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছেন না। ফজরের নামাজের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমি প্রস্তুত, বীজতলা থেকে চারা তোলা, চারা রোপণ আর সার প্রয়োগেই কাটছে তাদের ব্যস্ত সময়। তবে কৃষকদের এই স্বপ্নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সারের চড়া দাম। ভরা মৌসুমে সার কিনতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন প্রান্তিক চাষিরা।

মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা জানান, জেলাজুড়ে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তারা দিনরাত পরিশ্রম করছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলনের আশা করছেন। কিন্তু সার কিনতে গেলেই কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছেন। ভুক্তভোগী কৃষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এমনিতেই চাষের খরচ দিন দিন বাড়ছে। তার ওপর প্রতি বস্তা সারে যদি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বাড়তি গুনতে হয়, তবে আবাদের খরচ তোলা দায় হয়ে পড়বে।’ কৃষি অফিসের নির্ধারিত মূল্যের কোনো তোয়াক্কা না করেই প্রকাশ্যেই এই বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ। কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত সারের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি নজরদারি বাড়ানো না হলে আমন চাষে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। ফলে ভালো ফলন হলেও লোকসানের মুখে পড়তে পারেন জেলার হাজারো প্রান্তিক চাষি।

কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা, টিএসপি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত দামে কিনতে হচ্ছে। এতে সারসহ বীজ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও সেচ খরচ মিলিয়ে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। কৃষকরা বলছেন, বাড়তি খরচ করে ফসল উৎপাদনের পর বাজারে ন্যায্য দাম না পেলে লোকসানে পড়তে হতে পারে। ফলে একদিকে বাড়তি দামে সার কেনার চাপ, অন্যদিকে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে জেলায় বিভিন্ন ধরনের সারের মোট চাহিদা রয়েছে ১৩ হাজার ৯৭২ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১১ হাজার ৯০৫ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম রয়েছে ২ হাজার ৬৭ মেট্রিক টন। তবে বর্তমানে জেলায় ৭ হাজার ৫৯২ মেট্রিক টন সার মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। জামিরার চরের কৃষাণী রোকিয়া বেগম জানান, আমরা কৃষি পরিবার আমাদের অন্য কোনো ইনকাম নেই। মাঠে কাজ করা ছাড়া আর কোনো জায়গা নেই। আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে কৃষিকাজ করে ভাত খাই। এক একর জমিতে ধান লাগিয়েছি, সারের অভাবে ধান লাল হয়ে যাচ্ছে। এদিকে সবজির চারা লাগাব সার কোথাও পাচ্ছি না।

গোপালপুরের কৃষক নাদের হোসেন বলেন, ‘আমার যে পরিমাণ সার দরকার সে পরিমাণ খোলাবাজারে মাত্র পাঁচ কেজি সারও পাইনি, ডিলারের মাধ্যমে দিল, সেটিও আমরা পাইনি। প্রয়োজনে টাকা সুদের ওপর এনে সার কিনব তাও পাচ্ছি না। এভাবে আমরা কীভাবে চলব? আমাদের তো বাঁচতে হবে। সারের অভাবে আমি আবাদ করতে পারছি না। বেকার হয়ে বসে আছি।’ কৃষক জুয়েল রানা জানান, আমার ৪ একর জমিতে যে পরিমাণ সার প্রয়োজন সেভাবে পাচ্ছি না। খোলাবাজারে বিভিন্ন উপায়ে চড়া দামে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বাড়তি খরচ করে জমি চাষাবাদ করছি, এখন চিন্তা হলো সময়মতো ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে।

এদিকে গত শনিবার দুপুরে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়নের বাজিতেরপাড়া এলাকায় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে টিএসপি সার বিক্রির দায়ে এক বিএডিসি ডিলারকে ৮ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী।

সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের দায়িত্বের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. ফরিদুল ইসলামের দাবি, মাঠ পর্যায়ে সারের কোনো সংকট নেই। পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার সরবরাহ করা হচ্ছে। আমন ধানের কিছু জমিতে ইতিমধ্যে ইউরিয়া সারের প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও চলছে দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগ। তবে একটু অসুবিধা হচ্ছে যেহেতু আমন মৌসুমে কৃষকদের কথা বিবেচনা করে আপাতত অন্য আগাম জাতের কোনো ফসলে আমরা সেভাবে সার দিতে পারছি না। এই মুহূর্তে অনেক কৃষক মরিচের আবাদ নিয়েও ব্যস্ত হচ্ছে। তাদের কয়েকদিন পরে সার সরবরাহ করা হবে।

জামালপুর সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. এমদাদুল হক বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সার ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের লাভের পরিমাণও কমে যেতে পারে। তাই কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমিত ও সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য সব সময় কৃষকদের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ। তিনি আরও বলেন, সার সংকটের কোনো সুযোগ নেই। আমাদের উপসহকারী কর্মকর্তারা ডিলারের পয়েন্টে অবস্থান করেন। কাজেই সার নিয়ে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।