সংস্কার শেষে চালু হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি স্থান দেওয়াকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সামাজিক মাধ্যমের সুবাদে সারা দেশেই শুরু হয়েছে তোলপাড়। অনেকেই এটাকে দেশের জন্য এবং নতুন প্রজন্মের জন্য খারাপ বার্তা হিসেবেই দেখছেন। সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি টাঙানোর প্রতিবাদে এক শিক্ষার্থী ফ্রেম ভেঙে ছবি ছিঁড়ে ফেলেছেন। এর আগে ছবি অপসারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। একই ঘটনায় জিন্নাহর ছবির জায়গায় যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবি সাঁটিয়েছে ছাত্র ফেডারেশন।
এ ঘটনার পর সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। পুরো ঘটনায় ডাকসু নেতৃত্বকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।
সংস্কারের পর গত রবিবার দুপুরে ডাকসু ভবনের নিচতলায় সংগ্রহশালাটির উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা। এ সময় ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এসএম ফরহাদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংগ্রহশালা ঘুরে দেখা যায়, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান, পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির হত্যার পূর্বাপর নানা ঘটনার স্থিরচিত্র সেখানে স্থান পেয়েছে।
সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি রয়েছে। এর মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভার ছবি। ছবির ক্যাপশনে জিন্নাহ ঘোষিত ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ কথাটি উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি গ্রুপ ছবিতে জিন্নাহকে দেখা যায়। অপর ছবিটি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পেপার কাটিং, যাতে জিন্নাহর ছবি রয়েছে।
সংগ্রহশালায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, এমএজি আতাউল গণি ওসমানী, নবাব সলিমুল্লাহ, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ছবি রাখা হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক বা গুরুত্বপূর্ণ ছবি সংগ্রহশালায় রাখা হয়নি। তবে ১৯৭৪ সালে তার দুই ছেলের বিয়ের ছবি ও ছবিসংবলিত তিনটি পেপার কাটিং রাখা হয়েছে। আগে স্বাধীনতা আন্দোলনের যে গুরুত্বপূর্ণ ছবি ছিল সেগুলো অপসারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের কমান্ডার, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর মুখাবয়ব এবং সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবি রয়েছে সেখানে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ও সানি হত্যাকা-, ২০২০ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ছবিও সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়া থেকে শুরু করে সিঙ্গাপুর থেকে তার মরদেহ আনা, জানাজা এবং কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে দাফনের ছবিও সেখানে স্থান পেয়েছে।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি কেন রাখা হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, আমি জিন্নাহর ছবি রাখিনি, সেই ইভেন্টের ছবি রেখেছি। তা ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিবাদের সব আইকনের ছবি এখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
ছবি ছিঁড়ে ফেললেন আবু তৈয়ব
জিন্নাহর ছবি সংগ্রহশালায় স্থান পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর ক্যাম্পাসে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই গতকাল সোমবার দুপুরে ডাকসু নির্বাচনের আলোচিত সাবেক বয়োজ্যেষ্ঠ ভিপি প্রার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার সংগ্রহশালায় গিয়ে ফ্রেম ভেঙে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলেন।
ছবি ছেঁড়ার আগে তিনি বলেন, জিন্নাহ কার্জন হলে শিক্ষার্থীদের সামনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে, বাংলা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়েছিলেন। সেই জিন্নাহ ডাকসুতে স্থান পেতে পারেন না।
ছবি ভাঙার ঘটনার পর সোমবার সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ফাতিমা তাসনিম জুমা দাবি করেন, ভাঙচুর করা জিন্নাহর একক ছবি নয়।
তিনি লিখেছেন এই সন্ত্রাসীটা প্রথমে যে ছবিটা ভাঙছে, ওইটা একক জিন্নাহর ছবি না। ছবিটা ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় নির্বাচনের একটা পেপার কাটিং। সেই সময়ে ওই নিউজ মিডিয়া জিন্নাহর নামে একটি নিউজ করেছিল। কিন্তু আজ প্রায় ৬০ বছর পর দোষটা ডাকসুর হয়ে গেল।
ছবি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল রতন বলেন, এ ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ডাকসুতে ছবি ভাঙচুরের ঘটনাটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। এ ঘটনায় কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আইনগত পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।
২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম ছাত্রদলের
জিন্নাহর ছবি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ছবিটি অপসারণের দাবি জানায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। একই সঙ্গে ডাকসুর উদ্যোগে জুলাই আন্দোলনের স্মরণে স্থাপিত স্তম্ভ নিয়েও আপত্তি জানায় সংগঠনটি। সাক্ষাৎ শেষে ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বলেন, ডাকসু সংগ্রহশালা ও ভবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য, গৌরব, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জড়িত। সেখানে বিতর্কিত ব্যক্তিদের ছবি টাঙানো ‘নৈতিকভাবে ভুল’ এবং ‘ধৃষ্টতাপূর্ণ’ কাজ। আমরা ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছি, যাতে প্রশাসনিকভাবে দ্রুত দুটি ছবি অপসারণ করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ছবি অপসারণ না হলে উপাচার্যের কার্যালয় ও ডাকসু সংগ্রহশালায় কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, ভাষা আন্দোলনের পটভূমি তৈরিতে যার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, সেই পাকিস্তানের নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ডাকসু সংগ্রহশালায় টাঙানো হয়েছে। এর মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও গৌরবকে ক্ষুণœ করা হচ্ছে।
জুলাই আন্দোলনের স্মরণে ডাকসুর উদ্যোগে ক্যাম্পাসে স্থাপিত দুটি স্তম্ভ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে ছাত্রদল। সংগঠনটির দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের প্রক্রিয়া চলমান থাকাবস্থায় ডাকসু পৃথকভাবে দুটি স্তম্ভ স্থাপন করেছে।
জিন্নাহর জায়গায় গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবি
ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি স্থান দেওয়ার প্রতিবাদে সেই স্থানে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবি সাঁটিয়েছে ছাত্র ফেডারেশন। গতকাল বিকেল ৩টার দিকে ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে বামপন্থি নেতাকর্মীরা ছবিটি সাঁটান। জানতে চাইলে অর্ক বড়ুয়া বলেন, ডাকসু কারও বাপের না। ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন কেউ মেনে নেবে না। আর গোলাম আযমরা একাত্তরে যা করেছে, তার ফল স্বরূপ একাশিতে মানুষ তাকে জুতাপেটা করেছে। আমরা এ দেশের আপামর মানুষের সেই ইতিহাস সংরক্ষণ করেছি।
জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় : ঢাবি প্রশাসন
ডাকসু সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে তাদের অবস্থান জানায়।
ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের ‘দ্বৈত প্রশাসন’ প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। ডাকসু ছাত্র প্রতিনিধিত্বশীল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলেও এর সব কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই পরিচালিত হতে হবে।
প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে সমান্তরাল কোনো কাঠামো বা প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মর্যাদা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো আপস করা হবে না বলে জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।