চট্টগ্রাম শহর থেকে ফটিকছড়ির বিবিরহাট পর্যন্ত চলত ফোর্ড কোম্পানির জিপ। জিপ তো নয় যেন লোহার কঙ্কাল। ১৮৯০ দশকে নির্মিত এই স্ক্র্যাপ জিপগুলোর কোনো টিউব ছিল না। রশি দিয়ে প্যাঁচানো থাকত এর টায়ার রিং। ব্রেক ঠিকমতো কাজ করত না, কিন্তু চলত তুফানের মতো। চট্টগ্রামের লোকজন তাই একে বলত ‘তুফান মেইল’। এর চালকের চেয়ে সহকারীর কাজ ছিল বেশি। ইঞ্জিন গরম হলো কি না তার খেয়াল রাখা, কিছুক্ষণ পর পর ইঞ্জিনে পানি দেওয়া, ব্রেক না ধরলে চাকায় কাঠ দিয়ে চাপ দেওয়া; যাত্রী ওঠানো-নামানো সবই তার কাজ। চালকের কাজ শুধু স্ট্রেয়ারিংয়ে বসে থাকা। এই জিপে চাপাচাপি করে ছয় যাত্রী বসতে পারতেন। কিন্তু যাত্রী ওঠানো হতো কমপক্ষে বিশজন। যাত্রীদের ইঞ্জিনের ওপর এমনভাবে বসানো হতো, অনেক সময় চালক সামনের রাস্তাও দেখতে পেতেন না। পাদানিতেও ঝুলে থাকতেন অনেক যাত্রী।
ছোটবেলা থেকেই এই জিপের সঙ্গে চট্টগ্রামের খ্যাতিমান আলোকচিত্রী মোরতজা তওফিকুল ইসলামের পরিচয়। তার বাড়ির সামনে দিয়ে প্রতিদিন এই জিপ যাওয়া-আসা করত। ঘরের জানালা দিয়ে তিনি এর ছুটে চলা দেখতেন। কলেজ কিংবা মেডিকেল কলেজে যখন পড়তেন তখন তাকে নিয়মিত এই বাহনে চলাফেরা করতে হতো। ওই সময়ে চট্টগ্রামে তুফান মেইলের বেশ জনপ্রিয়তা ছিল।
১৯৬৪ সালের ঘটনা। মোরতজা তওফিকুল ইসলাম তখন ২৪ বছরের তরুণ। মেডিকেল কলেজের পড়াশোনা বাদ দিয়ে তিনি চট্টগ্রাম শহরের নিউ মার্কেটে ‘ফটোরমা’ নামে একটি স্টুডিও খুললেন। তার বাড়ি ফটিকছড়ি উপজেলার দৌলতপুরে। দৌলতপুর থেকে চট্টগ্রাম শহরের দূরত্ব প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। তুফান মেইলে চট্টগ্রামে যেতে সময় লাগে এক ঘন্টার একটু বেশি। তখন ভাড়া ছিল ছয় আনা। তওফিকুল এই ফোর্ট জিপে চড়ে প্রতিদিন চট্টগ্রামে গিয়ে স্টুডিওটি পরিচালনা করতেন।
তখন জানুয়ারি মাস। প্রতিদিনের মতো ওইদিনও ফোর্ট জিপে করে তিনি চট্টগ্রাম শহরে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে আগফা এইট এক্সপোজারের মিডিয়াম ফরমেট বক্স ক্যামরা। স্টুডিও খোলার আগে ২৬ টাকা দিয়ে ক্যামেরাটা কিনেছিলেন। ক্যামারেটা সবসময় তার সঙ্গেই থাকত। জিপটি যখন নাজিরহাটে পৌঁছল তখনই ঘটল ঘটনাটা। নাজিরহাট বাজারের কাছেই হালদা নদী। এই নদীর ওপর একটি পুরনো লোহার সেতু। সেতুর ওপর কোনো পাটাতন নেই। বাঁশ দিয়ে ঠেক দিয়ে রাখা হয়েছে সেতুটি। এমন ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর মাঝখানে এসে জিপটি বন্ধ হয়ে গেল। যাত্রীরা জিপ থেকে হুরমুড় করে নেমে জান বাঁচালেন। হেলপার কেতলি দিয়ে ইঞ্জিনে পানি ঢেলে জিপটি চালু করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কোনোভাবেই জিপটি চালু হচ্ছে না।
শীতকাল বলে হালদা নদীতে পানি কম। তওফিক ক্যামেরা নিয়ে নেমে গেলেন কোমর সমান পানিতে। নিচ থেকে দেখলেন কঙ্কালের মতো একটি সেতুর উপর দাঁড়িয়ে আছে একটি লক্কর-ঝক্কর জিপ। কুয়াশাময় আকাশটাকে ব্যাকগ্র্যাউন্ডে রেখে এই দৃশের এক রোল ছবি তুললেন। পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থার এক ভয়াবহ বাস্তবচিত্র ফুটে ওঠলো তার ছবিতে। ভেজা কাপড়ে ফটোরমা’য় গিয়ে ডার্করুমে ঢুকলেন। একটি ছবি প্রিন্ট করে নাম দিলেন ‘শতবর্ষ’। ১৯৮৬ সালে জাপানে এশিয়ান কালচারাল সেন্টার ফর ইউনেসকো যে আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, তিনি সেখানে ছবিটি পাঠালেন। সেই বছর ছবিটি ‘স্ট্রিট অ্যান্ড পিপলস’ ক্যাটাগরিতে ‘ফুজি ফিল্ম’ পুরস্কার জেতে।
চট্টগ্রামে এখন এই জিপের অস্তিত্ব নেই। সত্তরে দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে এর ব্যবহার একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এর অস্তিত্ব টিকে আছে তওফিকের ছবিতে। ১৯৮৬ সালের ১৪ আগস্ট চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বকোন পত্রিকায় ‘ছবি ও পুরনো গাড়ির গল্প’ শিরোনামে একটি ফিচার ছাপা হয়। সেখানেই পাওয়া যায় এই ছবি তোলার বিস্তারিত বিবরণ।
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে আলোকচিত্রের সুকুমার চর্চা, জ্ঞান বিতরণ আর সাংগঠনিক কর্মকান্ডে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন মোরতজা তওফিকুল ইসলাম। আলোকচিত্রের মায়ায় পড়ে তিনি তার বিশাল ক্যারিয়ারও বিসর্জন দিয়েছিলেন। মেডিকেলে পড়ার মাঝ পথেই পড়াশোনা বাদ দিয়ে ১৯৬২ সালে তিনি ছবি তোলাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম কলেজে তিনি ছিলেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সহপাঠী। কলেজে তারা এক সঙ্গে কৌতুক অভিনয় করতেন। ১৯৫৬ সালে হাইস্কুলে পড়ার সময় পাঁচ টাকার লটারি জিতে পান ‘আগফা ফ্লিক’ নামের একটি ক্যামেরা। সেই ক্যামেরা দিয়েই তার ফটোগ্রাফি শুরু। সারা জীবন আলোকচিত্রচর্চায় নিমগ্ন ছিলেন তিনি। চট্টগ্রামের চিত্রিত ইতিহাস তার ক্যামেরায় জীবন্ত হয়ে আছে।