জুয়ার ভয়ংকর ক্ষতি

জুয়ায় জড়ানো ভয়ংকর অপরাধ। অনেক সময় জুয়ার শুরুটা হয় বিনোদনের ছলে। সামান্য বাজি, টাকার নেশা কিংবা ভাগ্য পরীক্ষার কৌতূহল থেকে মানুষ এতে পা বাড়ায়। কিন্তু ধীরে ধীরে এই ক্ষণিকের মোহই হয়ে ওঠে সর্বনাশের কারণ। অর্থসম্পদ হারানোর পাশাপাশি জুয়া মানুষের বিবেক, মানসিক শান্তি ও পারিবারিক সুখও কেড়ে নেয়। সৃষ্টি করে শত্রুতা ও বিদ্বেষ। দূরে সরিয়ে দেয় আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত থেকে। তাই ইসলাম জুয়াকে শয়তানের নাপাক কর্ম হিসেবে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। সাময়িক লাভের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জুয়ার ভয়াবহ ক্ষতি সম্পর্কে প্রত্যেক মুসলমানের সচেতন হওয়া জরুরি।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন, এই দুটির মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্য উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়।’ (সুরা বাকারা ২১৯)

শয়তানের কাজ এবং সাফল্যের অন্তরায় : ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা মায়েদা ৯০)

প্রকারভেদ : আরবের জাহেলি সমাজে জুয়ার বহুমাত্রিক রূপ ও ব্যবহার প্রচলিত ছিল। যেমন দুটি মোরগের লড়াইয়ে বাজি ধরা, কবুতর ওড়ানোর প্রতিযোগিতায় বাজি লাগানো এবং উটের এক বিশেষ খেলায় বাজি খেলা এবং বাজিতে পাশা বা দাবা খেলা। (আদাবুল মুফরাদ ১২৭১-১২৮৮)

আধুনিক রূপান্তর : বর্তমানে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় জুয়ার রূপে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ফলে অনেক সরলমনা মুসলমান এটিকে খেলা বা নিছক বিনোদন মনে করে নিজের অজান্তেই জড়িয়ে পড়ছেন জুয়ায়। এই বিষয়ে যথাযথ সতর্কতা ও সচেতনতা কাম্য। অন্যথায় দুনিয়া ও পরকালের জীবন বরবাদ হবে। জুয়ার মধ্যে দ্বীনি ও দুনিয়াবি বহুবিধ ক্ষতি বিদ্যমান। কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।

পারস্পরিক শত্রুতা ও ইবাদতে উদাসীনতা : আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শুত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে। অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না?’ (সুরা মায়েদা ৯১)

অন্যের সম্পদ গ্রাস করা : জুয়ার মাধ্যমে মূলত কোনো বৈধ বিনিময় ছাড়াই অন্যের সম্পদ লুটে নেওয়া হয়। অথচ আল্লাহ তা থেকে নিষেধ করে বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না।’ (সুরা নিসা ২৯)

দোয়া কবুল না হওয়া : জুয়ার মাধ্যমে অর্জিত আয় সম্পূর্ণ হারাম। আর হারাম উপার্জনে গঠিত খাদ্য গ্রহণকারীর কোনো ইবাদত বা দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে বলেন, এক দূর-দূরান্ত পর্যন্ত দীর্ঘ সফর করে। ফলে সে ধূলিধূসরিত রুক্ষ কেশধারী হয়ে পড়ে। অতঃপর সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং আহার্যও হারাম। কাজেই এমন ব্যক্তির দোয়া তিনি কীভাবে কবুল করতে পারেন? (সহিহ মুসলিম ২২৩৬)

আর্থিক লোকসান : জুয়ায় সাময়িক বা বাহ্যিক লোভ মানুষকে অন্ধ করে দিলেও মূলত এতে লাভের চেয়ে আর্থিক লোকসানই অবধারিত। বাস্তবেও দেখা যায়, যারা জুয়া খেলায়, এক পর্যায়ে গিয়ে তারা নিঃস্বই হয়। সুতরাং সাময়িক লাভ থাকলেও জুয়ায় ক্ষতি অবধারিত।

মানসিক বিপর্যয় : জুয়া খেলার ফলে মানসিক অস্থিরতা ও হতাশা বাড়ে, যা পরিবারে নিত্যদিন কলহ সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত সংসার ভাঙন বা আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায়। সুতরাং জুয়া বিপর্যয় ছাড়া আর কিছুই ডেকে আনে না।

অপরাধ বৃদ্ধি : জুয়ার টাকার জোগান দিতে গিয়ে ব্যক্তি চুরি, ডাকাতি ও দুর্নীতির মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, যা সমাজ ও রাষ্ট্রে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।

জান্নাত থেকে বঞ্চিত : জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়াই জুয়াড়ি ব্যক্তির জন্য সব থেকে বড় ক্ষতি। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, জুয়াড়ি, উপকার করার পর খোঁটাদানকারী এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সুনানে নাসয়ি ৫৬৭২)

শিক্ষণীয় ঘটনা : একবার এক যুবক অত্যন্ত পেরেশান হয়ে খলিফা আবদুল মালিকের দরবারে এলো। খলিফা তার পেরেশানির কারণ জানতে চাইলে উত্তরে যুবক বলল, আমি আমার গুনাহের কারণে অত্যন্ত পেরেশানিতে আছি। খলিফা বললেন, তোমার গুনাহ কি আসমান-জমিন অথবা আল্লাহর আরশ থেকেও বড়? যুবক বলল, হ্যাঁ। খলিফা তখন বলল, তোমার গুনাহ বড়, নাকি আল্লাহর রহমত বড়? এই প্রশ্ন শুনে যুবক নিশ্চুপ হয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল। অতঃপর যুবক বলল, আমি একজন কাফন চোর ছিলাম। পাঁচটি কবরের ভেতরের ভয়ানক বর্ণনাতীত অবস্থা আমাকে তওবা করার জন্য সতর্ক করেছে। সে বলল, যখন আমি পঞ্চম কবরটি খনন করলাম, তখন দেখতে পেলাম, সেই মৃত ব্যক্তির ওপর আগুনের পিলার দিয়ে নির্মমভাবে আঘাত করা হচ্ছে। এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে আমি পালিয়ে আসি। ঠিক সেই মুহূর্তে গায়েব থেকে আওয়াজ এলো, তুমি তাকে এই শাস্তির কারণ জিজ্ঞেস করলে না কেন? আমি বললাম, আমার এই ক্ষমতা নেই। তখন গায়েব থেকে বলা হলো, এই লোকটি দুনিয়াতে জুয়াড়ি ছিল। সে সবসময় জুয়া খেলত, তাই আজ তার এই শাস্তি হচ্ছে। (মাআরিফুস সুলতান ১০/৪৪-৪৫)

লেখক : ধর্মীয় নিবন্ধকার