রাগের সময় ধৈর্য কেন জরুরি

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০১ এএম

রাগ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। অন্যায়, অপমান, অবহেলা কিংবা প্রত্যাশা ভঙ্গের কারণে মানুষ রাগান্বিত হয়। কিন্তু রাগের মুহূর্তে মানুষ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে ছোট ঘটনাও বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। একটি কঠিন কথা ভেঙে দিতে পারে পুরনো সম্পর্ক। মুহূর্তের উত্তেজনায় নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত সারা জীবনের অনুশোচনা হয়ে থাকতে পারে। তাই ইসলাম রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা দিয়েছে। আর এই নিয়ন্ত্রণের অন্যতম বড় মাধ্যম হলো ধৈর্য।

রাগের সময় মানুষের বিবেক ও বিচারবোধ অনেক সময় দুর্বল হয়ে যায়। তখন সে এমন কথা বলে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় কখনো বলে না। এমন কাজও করে বসে, যার পরিণতি সম্পর্কে পরে চিন্তা করতে হয়। রাগের মুহূর্তে মুখ থেকে বের হওয়া একটি বাক্য কাউকে গভীরভাবে আহত করতে পারে। আবার সামান্য একটি বিরোধ কখনো কখনো মারামারি, সম্পর্কচ্ছেদ কিংবা আরও বড় অপরাধের দিকে গড়াতে পারে। তাই রাগের মুহূর্তে ধৈর্য ধারণ করা জরুরি।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মুত্তাকিদের একটি বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যারা সচ্ছলতা ও অভাবের সময় ব্যয় করে, রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান ১৩৪)

এই আয়াতে রাগ সংবরণকে তাকওয়াবান মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। লক্ষ করার বিষয় হলো, শুধু রাগ না করার কথা বলা হয়নি। বরং রাগ আসার পরও তা নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলা হয়েছে। কারণ মানুষ হিসেবে রাগ আসতেই পারে। কিন্তু রাগের বশে অন্যায় করা যাবে না। নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাই একজন মুমিনের শক্তি।

আমরা অনেক সময় মনে করি, শক্তিশালী মানুষ সে, যে অন্যকে পরাজিত করতে পারে কিংবা নিজের ক্ষমতা দিয়ে অন্যকে ভয় দেখাতে পারে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত শক্তি ভিন্ন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে। বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। (সহিহ বুখারি ৬১১৪)

এই হাদিস আমাদের শক্তির একটি নতুন পরিচয় দেয়। রাগের সময় চিৎকার করা সহজ। প্রতিশোধ নেওয়া সহজ। কঠিন ভাষায় জবাব দেওয়া সহজ। কিন্তু উত্তেজনার মুহূর্তে নিজেকে থামিয়ে দেওয়া সহজ নয়। নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখা, হাতকে অন্যায় থেকে বিরত রাখা এবং আবেগের পরিবর্তে বিবেকের অনুসরণ করা সত্যিই বড় শক্তির পরিচয়।

রাগের সময় ধৈর্য জরুরি হওয়ার প্রথম কারণ হলো, রাগ মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। উত্তেজিত অবস্থায় মানুষ অনেক সময় পরিস্থিতির পুরো সত্য বুঝতে পারে না। সে একপক্ষের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। পরে জানা যায়, ঘটনাটি আসলে অন্য রকম ছিল। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে গেছে। তাই রাগের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত না নিয়ে কিছু সময় অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ। ধৈর্য মানুষকে চিন্তা করার সুযোগ দেয়। আবেগের ঝড় থেমে গেলে পরিস্থিতি অনেক পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

পারিবারিক জীবনে রাগ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন আরও বেশি। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান কিংবা ভাই-বোনের মধ্যে মতের পার্থক্য হতেই পারে। কিন্তু রাগের সময় বলা কঠিন কথা দীর্ঘদিনের ভালোবাসাকে আহত করতে পারে। অনেক সম্পর্ক ভেঙে যায় এমন কিছু কথার কারণে, যা বলা হয়েছিল মাত্র কয়েক মিনিটের উত্তেজনায়। পরে ক্ষমা চাইলেও সব সময় ক্ষত পুরোপুরি শুকায় না। তাই পরিবারের শান্তি রক্ষার জন্য রাগের মুহূর্তে ধৈর্য অত্যন্ত প্রয়োজন।

সন্তানদের ক্ষেত্রেও এ শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা ভুল করবে, দুষ্টুমি করবে, অবাধ্যতাও দেখাতে পারে। কিন্তু রাগের মাথায় কঠোর আচরণ করলে তাদের মনে ভয় ও দূরত্ব তৈরি হতে পারে। একজন অভিভাবক যদি ধৈর্যের সঙ্গে সন্তানকে ভুল বুঝিয়ে দেন, তাহলে তার শিক্ষা অনেক বেশি কার্যকর হয়। একইভাবে কর্মক্ষেত্রেও রাগের কারণে সহকর্মী বা অধীনস্তদের সঙ্গে খারাপ আচরণ সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে।

লেখক : ইসলামি গবেষক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত