রিয়ালকে ‘না’ বলা কঠিন ছিল, তবে বার্সার ফুটবলটাই টেনেছে রদ্রিকে

রদ্রির বার্সেলোনায় নাম লেখানোটা যেন এবারের গ্রীষ্মের দলবদলে ইউরোপিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বড় চমক। ব্যালন ডি’অরজয়ী এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডারের সম্ভাব্য গন্তব্য নিয়ে যখন রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে দরকষাকষির গুঞ্জন তুঙ্গে, ঠিক তখনই সব হিসাব পাল্টে দিয়ে কাতালান শিবিরে ঠাঁই নেন তিনি। ইতিহাদের পাট চুকিয়ে বার্সার লাল-নীল জার্সিতে তার এই দুঃসাহসী পদার্পণ ইতোমধ্যেই ফুটবলপ্রেমীদের মনে তীব্র কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।

আর ঠিক এই পটভূমিতেই ভেতরের সব না-বলা কথা নিয়ে হাজির হলেন রদ্রি নিজেই। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘মুন্দো দেপোর্তিভো’কে দেওয়া এক সুদীর্ঘ ও খোলামেলা সাক্ষাৎকারে তিনি অকপটে কথা বলেছেন রিয়ালের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পেছনের আসল সমীকরণ, হান্সি ফ্লিকের কড়া ডিফেন্সিভ দর্শন, পেদ্রির সঙ্গে মাঝমাঠের বোঝাপড়া, মেস্তায়ার বেঞ্চে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া কিংবা তরুণ মার্ক বার্নালকে মেন্টর করার দারুণ সব পরিকল্পনা নিয়ে।

কেন রিয়াল মাদ্রিদের প্রস্তাব ফিরিয়ে বার্সেলোনায়? 

রিয়াল মাদ্রিদ ও কোচ হোসে মরিনহোর সঙ্গে আলোচনা হওয়ার পরও কেন বার্সেলোনাকে বেছে নিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে রদ্রি জানান তার সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি ছিল খেলার মান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। ‘আমি সবসময় আমার সিদ্ধান্তগুলো খেলার যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়েছি, যেখানে আমি জিততে পারব, খুশি থাকতে পারব এবং একজন খেলোয়াড় হিসেবে সবচেয়ে বেশি বেড়ে উঠতে পারব। রিয়াল মাদ্রিদ আমাকে ব্যতিক্রমীভাবে ভালো আচরণ করেছিল, তাদের না বলাটা সহজ ছিল না; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডেকো ও হান্সি ফ্লিকের নেতৃত্ব আমাকে সন্তুষ্ট করেছে।’

মরিনহোর প্রস্তাব ও মিডিয়ার গুঞ্জন নিয়ে খোলামেলা রদ্রি

রিয়াল কোচ মরিনহো ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে কথা বললেও গোপনীয়তার খাতিরে সেই আলাপের বিস্তারিত প্রকাশ করতে চাননি রদ্রি। তবে রিয়ালকে ‘না’ বলাটা কেন কঠিন ছিল তা বুঝিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমি কখনোই ব্যক্তিগত কথোপকথন প্রকাশ করা উপযুক্ত মনে করি না, তবে তিনি স্পষ্টভাবেই আমাকে আনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আমি যখন সিদ্ধান্ত নিলাম, তখন তাকে ধন্যবাদ জানাতে নিজেও কল করেছিলাম।’ 

রদ্রি জানান, বার্সেলোনা তাকে কোনো সংখ্যা বা আর্থিক লোভ দেখিয়ে ভেড়ায়নি; বরং ডেকো ও হান্সি ফ্লিক পুরোপুরি ফুটবলীয় দর্শন আর আন্তরিক পরিবেশ দিয়ে তাকে রাজি করিয়েছেন। এছাড়া রিয়াল মাদ্রিদকে ঘিরে চলা গুঞ্জন, ব্যালন ডি’অর গালার বয়কট কিংবা গণমাধ্যমের অহেতুক আলোচনাকে পাত্তা না দিয়ে পুরোপুরি মাঠের খেলায় ডুবে থাকতে চান। তিনি বলেন, ‘যারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না, সেই সুন্দর মুহূর্তটির অংশ ছিলেন না। তাদের নিয়ে কথা বলার কোনো মানে হয় না। যে কেউ আমাকে চেনে, সে জানে আমি এই মিডিয়া সার্কিট থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি। আমি শুধু ফুটবলে ফোকাস করি।’ 

ফ্লিকের নিখুঁত ফুটবলে বার্সার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ স্বপ্ন

বার্সেলোনার কোচ ফ্লিকের কড়া ডিফেন্সিভ লাইন ও মানসিকতা রদ্রিকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তার সম্পর্কে নিজের ভালোলাগার কথা জানিয়ে বলেন, ‘হান্সি ফ্লিক সম্পর্কে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে, তা হলো তার চরিত্র প্রতিদিন উন্নতি করার আকাঙ্ক্ষা, নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা, যা আমার নিজের ফিলোসফির সাথে একদম মিলে যায়।’ 

দলের প্রধান লক্ষ্য চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় প্রসঙ্গে রদ্রি একটু বাস্তবসম্মত সুরেই বলেন, ‘চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এমন কোনো টুর্নামেন্ট নয় যে কে সেরা তা বিচার করবে; এটি মুহূর্তের খেলা এবং সেই মুহূর্তগুলো বুঝতে পারা জরুরি। এই দলটির এখনো উন্নতি করার কিছু জায়গা রয়েছে এবং আমি এখানে এসেছি দলকে সেই অতিরিক্ত ভরসাটুকু দিতে।’

সতীর্থদের প্রশংসা

বার্সেলোনার মিডফিল্ডে সতীর্থ পেদ্রির সঙ্গে বোঝাপড়া কেমন হবে, তা ব্যাখ্যা করে রদ্রি বলেন, ‘পেদ্রি এমন একজন খেলোয়াড় যাকে বল দিলে সে নিজেই সমস্যার সমাধান করে দেয়। আমি তাকে স্ট্রাকচার ও সলিডিটি দিতে পারি, যাতে তাকে অযথা এদিক-ওদিক বেশি দৌড়াতে না হয়।’ এছাড়া দলের ফরোয়ার্ড রাফিনহার অবিশ্বাস্য শারীরিক সক্ষমতা ও ফর্ম দেখে অবাক হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

ব্যালন ডি’অর এবং লামিন ইয়ামাল প্রসঙ্গে

ব্যালন ডি’অর জয়ের পর অতীতে রদ্রি বলেছিলেন যে লামিন ইয়ামালের কাছে একদিন এই পুরস্কার জেতার সব উপকরণই থাকবে। এবারের ব্যালন ডি’অরে ইয়ামালের সময় এসেছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ‘আমি জানি না, আপনি আমাকে এমন এক প্রশ্ন করছেন যার উত্তর আমার জানা নেই। তবে আমি এটুকু বলতে পারি, সে অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়ে ওঠা এক তরুণ; গত দেড় বছর তার দুর্দান্ত কেটেছে এবং নিঃসন্দেহে তাকে আপনি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে রাখতে পারেন।’

বার্সেলোনা ক্লাব কর্তৃপক্ষ ইয়ামালের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ আছে কি না জানতে চাইলে রদ্রি বলেন, ‘না, ক্লাবের এমন পছন্দ আমি সম্পূর্ণ বুঝতে পারি। ইয়ামাল একজন ঘরোয়া প্রতিভা, যা তাদের কাছে সবকিছুর চেয়ে বড়। এটি ১০০ জন ভোটারের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, যাকে বেছে নেওয়া হবে আমরা তাকে অভিনন্দন জানাব।’ 

মেস্তায়ার বেঞ্চে ঘটে যাওয়া ভুল ও ক্ষমা প্রার্থনা

ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে মেস্তায়া স্টেডিয়ামে বার্সেলোনার বেঞ্চে পাউ কুবারসির সঙ্গে কথপোকথনের একটি ভিডিও ক্যামেরা বন্দী হওয়ার পর তা নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে রদ্রি, ‘হ্যাঁ, আমি সেদিনই এ কথা বলেছি। এই জীবনে আপনাকে জানতে হবে কখন নিজেকে সংশোধন করতে হয় এবং কোথায় ভুল করেছেন। আমি স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা করি না যে আমি ভুল করেছিলাম। হয়তো কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত কথা বলার জন্য নয়, বরং যে মুহূর্ত এবং প্রেক্ষাপটে এটি ঘটেছে তার জন্য। স্প্যানিশ লিগ আলাদা এবং এমনটা ঘটতেই পারে। তাই আমি ক্ষমা চেয়েছি এবং এর মাধ্যমে কোনো খেলোয়াড় বা ক্লাবকে অপমান করার বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য আমার ছিল না।’ সাত বছর ইংল্যান্ডে থাকার কারণে সেখানে এমন ক্যামেরা-বন্দী সংস্কৃতি না থাকায় এটি তার জন্য একটি বড় শিক্ষা বলেও জানান তিনি।

বয়স ত্রিশ ছুঁলেও ক্ষুধা কমেনি, লক্ষ্য মার্ক বার্নালকে মেন্টর করা

বয়স ৩০ হয়ে যাওয়ার পরও খেলায় একই ক্ষুধা ধরে রাখার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘অনেকে ভাবতে পারেন বয়স বাড়লে আর সাফল্য পেলে ক্ষুধা কমে যায়, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উল্টো। আমরা ভাগ্যবান যে এই পেশায় আছি এবং বড় কিছু করার সামর্থ্য যখন আছে, তখন সেটার জন্য লড়াই করতেই হবে।’

কনিষ্ঠ সতীর্থদের বিশেষ করে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার মার্ক বার্নালকে গড়ে তোলা নিয়ে তিনি বলেন, ‘সম্ভবত ২১ বছর বয়সে আমি এই কথা বলতাম না, কিন্তু এখন অন্য খেলোয়াড়দের বেড়ে উঠতে সাহায্য করা আমাকে দারুণ অনুপ্রাণিত করে। মার্ক বার্নাল অবিশ্বাস্য সম্ভাবনাময় এক দারুণ ছেলে। ডিফেন্সিভ ও সেন্ট্রাল মিডফিল্ড উভয় পজিশনেই তার খেলার ক্ষমতা আছে। তার শারীরিক গঠন, কোয়ালিটি, বুদ্ধিমত্তা এবং শেখার আগ্রহ সব মিলিয়ে তার মধ্যে সবকিছুই রয়েছে।’ 

ম্যানচেস্টার সিটি থেকে হুলিয়ান আলভারেজকে কি বার্সেলোনায় চাইবেন?

সাবেক ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে একসঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড আলভারেজকে বার্সেলোনায় দেখতে চান কি না এমন কৌতূহলী প্রশ্নের জবাবে রদ্রি বলেন, ‘সে দারুণ খেলোয়াড়। অবশ্যই আমি হুলিয়ানকে সই করাতে চাইব। সৌভাগ্যবশত তার সঙ্গে দুই বছর খেলার সুযোগ আমার হয়েছে এবং আমার মতে সে অবিশ্বাস্য এক খেলোয়াড়।’  আলভারেজ কেবল খাঁটি নম্বর নাইন নন, প্রয়োজনে নম্বর ১০ বা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডেও সমান পারদর্শী বলে জানান এই স্প্যানিশ তারকা।

বার্সেলোনা সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বার্তা

উপস্থাপনার দিন থেকেই বার্সেলোনা সমর্থকদের অভূতপূর্ব ভালোবাসায় মুগ্ধ এই বিশ্বকাপজয়ী তারকা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি বার্সেলোনায় এসেছি অবদান রাখতে এবং সমর্থকদের গতকাল ও পরশুদিনের চেয়ে একটু বেশি সুখী করতে চেষ্টা করতে।’ রিয়ালের প্রস্তাব ফিরিয়ে বার্সেলোনার ‘ফ্যামিলি ক্লাব’ সংস্কৃতিতে মানিয়ে নেওয়া রড্রি এখন সামনের দিনগুলোতে নিজের সেরাটা দেওয়ার অপেক্ষায়।