দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া ৬৩ বিদেশি নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা নিয়ে বিপাকে পড়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। আজ মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামের একটি আদালত অনলাইন প্রতারণার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে তাদের প্রত্যেকের দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, সমস্যা একটাই। সেটি হলো ভাষা। গ্রেপ্তার ৬৩ জনের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন ইংরেজি বলতে পারেন।গ্রেপ্তার বিদেশিদের মধ্যে লাওসের ৩৪ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের পাঁচজন, নেপালের একজন ও ভিয়েতনামের একজন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২০ জন নারী।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে দোভাষী পাওয়া না গেলে এআই প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হবে। এজন্য রিমান্ড মঞ্জুর হলেও এখনই তাদের পুলিশ হেফাজতে নিতে পারছেন না।
গত বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানার জালালাবাদ আবাসিক এলাকার একটি আটতলা ভবনে অভিযান চালিয়ে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিইউ) ও খুলশী থানা-পুলিশ।
পুলিশের দাবি, প্রায় দেড় মাস ধরে ওই ভবনে অবস্থান করে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণাসহ অনলাইন অপরাধ চালিয়ে আসছিলেন তারা।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, 'গ্রেপ্তার বিদেশি নাগরিকদের অপরাধ সম্পর্কে জানতে হলে তাদের নিজ ভাষায় কথা বলতে হবে, যাতে তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে পারেন। এজন্য দোভাষী নিয়োগসহ দুটি পদ্ধতির কথা ভাবলেও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।'
তবে এ বিষয়ে জানতে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের রাসেল মাহমুদের মোবাইলে একাধিকবার করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য জানা যায়নি।
তবে একই সংস্থার অতিরিক্ত উপকমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, আসামিদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রাথমিকভাবে দুটি পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছে। একটি হচ্ছে ডিভাইসের মাধ্যমে। ডিভাইস দিয়ে এআই বা গুগলের সহায়তায় ভাষা ট্রান্সলেট করে আসামিদের নিজ ভাষায় জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে। অন্যটি হচ্ছে দোভাষী নিয়োগের মাধ্যমে। তবে দোভাষী নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়টি একটু সময়সাপেক্ষ।'
সিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত কোন পদ্ধতি ব্যবহার করে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বা কবে আসামিদের রিমান্ডে আনা হবে তা এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে খুব শিগগিরই আসামিদের রিমান্ডে আনা হবে বলে জানান চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ।
তিনি বলেন, আসামিদের ভাষাগত সমস্যার জন্য দোভাষী নিয়োগ বা অন্য কোনো পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে আশা করছি খুব শিগগিরই এটা চূড়ান্ত হবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেপ্তার ৬৩ জনের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওসের আছে ৩৪ জন। তাদের জন্য দোভাষী খুঁজে বের করা কঠিন। এতে প্রাথমিকভাবে ডিভাইসের পদ্ধতি ব্যবহার করে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহিদুল ইসলামের আদালত পুলিশের সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৬৩ বিদেশি নাগরিকের প্রত্যেককে দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ হাসান ইকবাল চৌধুরী বলেন, গত ১২ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশি নাগরিককে আদালতে তোলার পর প্রত্যেক আসামিকে সাত দিন করে রিমান্ড আবেদন করেছিল পুলিশ। মঙ্গলবার আদালত রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানি শেষে প্রত্যেক আসামিকে দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুরের আদেশ দেন আদালত। পাশাপাশি আগামী ২০ দিনের মধ্যে রিমান্ড প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে বলা হয়েছে।
কাউন্টার টেরোরিজম সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারের পর তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে অপরাধমূলক তৎপরতা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু দুই-তিনজন পাকিস্তানি নাগরিক ছাড়া বাকিরা কেউই নিজ দেশের ভাষা ছাড়া ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষা বুঝছেন না। তদন্ত কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা কোনো কথা বলতে পারছেন না। কাউন্টার টেরোরিজম যা তথ্য পেয়েছে তা দুই-তিনজন পাকিস্তানি নাগরিকের কাছ থেকে পেয়েছিল।
৬৩ বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার অভিযানের সময় আটতলা বাড়ির বিভিন্ন ফ্ল্যাট থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, চারটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আরও বেশ কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় খুলশী থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে করা মামলায় পরে তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে চট্টগ্রাম কারাগারে পাঠানো হয়। এছাড়া একই ঘটনায় বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট জমা রাখা মো. মহসীন নামে বাংলাদেশি এক সহযোগীকে গত শনিবার নগরের খুলশী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকেও সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
পুলিশ জানায়, আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আজ মঙ্গলবার মহসীনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।