ফেসবুক পোস্টে সন্তানকে ফিরে পেলেন বাবা-মা

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২১ পিএম

বিকেল চারটা বেজে ১৫ মিনিট। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক নম্বর গেটের সামনে তখন ছোটখাটো এক জটলা। ভেতর থেকে ভেসে আসছে কান্নার সুর। ভিড় ঠেলে সামনে এগোতেই চোখে পড়ে এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য। প্রায় ৩০ বছর বয়সী এক তরুণকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিলাপের সুরে কাঁদছেন এক বয়স্ক নারী। তবে এটি শোকের কোনো বিলাপ নয়, প্রায় দেড় মাস ধরে নিখোঁজ থাকা সন্তানকে ফিরে পাওয়ার পরম আনন্দের কান্না।

স্বজনরা জানান, ফিরে পাওয়া এই তরুণের নাম আব্দুল কাইয়ুম। এক মাস ১১ দিন আগে চট্টগ্রাম নগরীর রৌফাবাদ এলাকার বাসা থেকে হঠাৎ হারিয়ে যান তিনি। ঢাকায় একটি কোম্পানিতে চাকরি করলেও মানসিক সমস্যা দেখা দেওয়ায় তাকে চিকিৎসার জন্য বাসায় নিয়ে আসা হয়। পরে বাসা থেকে নিখোঁজ হয়ে যায় কাইয়ুম। নিখোঁজের পর থেকে তাদের দিন কেটেছে চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগে। স্বজনেরা সম্ভাব্য সব জায়গায় সন্ধান চালিয়েও কোনো খোঁজ পাননি। 

কাইয়ুমের মা অশ্রুসজল চোখে বলেন, ‘টানা এক মাস ১১ দিন সব জায়গায় খুঁজেছি। থানায় জিডি করেছি, কবিরাজ-বৈদ্যর কাছেও গেছি। লাখ লাখ টাকা ঢেলেছি তাদের পেছনে। তবুও কোনো পাত্তা মেলেনি। অবশেষে আমার বড় নাতি একজনের ফেসবুক পোস্টে কাইয়ুমের ছবি দেখতে পায়। সেই সূত্র ধরেই আমরা এখানে ছুটে এসে ওকে খুঁজে পাই।’

অনলাইনে ছবি দেখে স্বজনেরা যখন চমেক হাসপাতালের এক নম্বর গেটের পাশে এসে পৌঁছান, তখন জীর্ণশীর্ণ শরীরে জবুথবু হয়ে পড়ে ছিলেন কাইয়ুম। পরনে ময়লাযুক্ত হাফ প্যান্ট, এক পায়ে ব্যান্ডেজ আর হাতে একাধিক ক্ষতের চিহ্ন। পাশে রাখা কেবল একটি খাবারের বক্স। 

কাইয়ুমের মা বলেন, ‘আমার ছেলে দেখতে অনেক সুন্দর ছিল। ঢাকায় একটি কোম্পানিতে চাকরি করত। সেখানে হঠাৎ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে ওর বাবা গিয়ে নিয়ে আসে। শুক্রবার সকালে তাকে বাসায় আনা হয়, আর শনিবার সকালেই সে গায়েব হয়ে যায়। এই কদিনে শুকিয়ে পুরো বিবর্ণ হয়ে গেছে ছেলেটা।’

হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজনরা জানান, বেশ কিছুদিন ধরেই তরুণটিকে চমেক হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ঘুরতে দেখা গেছে। আবুল বশর নামের এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘গত আট দিন ধরে আমি ওকে দেখছি। একেক সময় একেক গেটে কিংবা মসজিদের সামনে বসে থাকত। বাড়ি কোথায় বা কেউ আছে কি না জানতে চাইলে বলত, ‘কেউ নেই’।’

আরেক রোগীর স্বজন মো. রমজান জানান, ‘গত তিন দিন ধরে ছেলেটিকে ডেন্টাল ইউনিটের সামনে বালুর ওপর পড়ে থাকতে দেখেছি। বৃষ্টি শুরু হলে কেউ একজন তাকে তুলনামূলক শুকনো জায়গায় এনে বসিয়ে দেয়। আজ হঠাৎ দেখি ওর মা-বাবা এসে হাজির। তারা নাকি ফেসবুকে ছবি দেখে সন্ধান পেয়েছেন।’ নিখোঁজ ছেলেকে দীর্ঘ দিন পর কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত কাইয়ুমের বাবা। ছেলের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা দেখে ভারাক্রান্ত হলেও ছেলেকে পেয়ে বেশ খুশি। তিনি বলেন, ছেলে হারিয়ে যাওয়ার পর হন্য হয়ে সব জায়গায় খুঁজেছি। অবশেষে পেয়েছি।  আমার ছেলের সুস্থতার জন্য যা যা করা দরকার, আমি তার সব করব। ছেলেকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেয়েছি, এর চেয়ে বড় শুকরিয়া আর কিছু হতে পারে না।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত