পাথারিয়ায় ঝরনার মেলা

উঁচু পাহাড়। ঘন জঙ্গল। দিগন্ত ছোঁয়া গাছগাছালি। বানর, উল্লুকের হাঁকডাক। দিনে দুপুরেই ঝিঁঝি পোকার শব্দ। শিলাকূপের গভীরতায় ঝিরির শব্দ জমে থাকা শীতল পানি। কখনো-বা কলকল শব্দ তুলে দ্রুতবেগে ঝিরির স্বচ্ছ জলের অবিরাম ছুটে চলা। কখনো-বা আবার পাহাড়ের ছোট ছোট খাঁজে থাকা পানিতে, মাছদের সাঁতরে বেড়ানো। যেতে যেতে একটা সময় আপনাকে নৈঃশব্দ ঘিরে ফেলবে। এমনি মায়াবি পরিবেশে প্রকৃতির মধ্যে ডুবে মনপ্রাণ বিলীন হয়ে যাওয়ার পর, চেতনা ফিরে আসবে মহিষা আর টাইগার জোঁকের উৎপাতে। আমার এবারের গন্তব্য সীমান্ত ঘেঁষা আদিম পাথারিয়া ঝরনা দেখা।

দে-ছুট ভ্রমণ সংগঠনের বন্ধুরা একদিন রাতের গাড়িতে চলে যাই মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার ডিমাই বাজার। রাস্তায় জ্যামের কারণে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যায়। শেষ রক্ষা গাইড সময় মতোই হাজির ছিল। সময় নষ্ট না করে দ্রুত পোশাক বদলিয়ে সিএনজিতে চেপে আহমদপুর গ্রামের পথে রওনা হই। সেখানে পৌঁছে সিএনজি ছেড়ে পায়ে হেঁটে ডিমাই গ্রাম পেরিয়ে মোকামপুঞ্জি ধরে সামনে এগুতে থাকি। যেতে যেতে পাথারিয়া পাহাড়ের জঙ্গলের সুনসান নীরবতা চারপাশ গ্রাস করেছে। একটু আগাতেই ঝরনার পানির শব্দ কানে ভেসে আসে। হালকা নাশতা সেরেই পুরোদমে আবারও হাইকিং। শুরুতেই চোখে ধরা দেয় ঝেরঝেরী ঝরনা। বেশ উঁচ পাহাড়ের দুপাশ থেকে গড়িয়ে পড়ছে পানি। প্রথম দেখাতেই ঝেরঝেরী নজর কেড়ে নেয়। সামনে রয়েছে আরও কয়েকটি ঝরনা। তাই আবারও হাইকিং শুরু করি। অল্প কিছু দূর যেতেই চোখ আটকালো পানজুমাই ঝরনায়। ঝরনার কাছাকাছি পৌঁছতেই আমি হতবিহ্বল। অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পানজুমাই। আস্তে আস্তে ঝরনার কাছে চলে যাই। পিচ্ছিল পাথুরে বোল্ডার পেরিয়ে ঝরনার ওপরে উঠে যাই। পানজুমাই ঝরনার ওপরটা সত্যিই অসাধারণ সৌন্দর্যে ঘেরা। পাহাড়ের গায়ে রয়েল বেঙ্গলের মতো ডোরাকাটা সোনালি রেখা। ঝরনার পানি পড়তে পড়তে প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্ট বাথটাব। গলা সমান টলটলে পানি। জলাশয়ে বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কেটে এবার সুড়ঙ্গের মতো পাহাড়ের পাশ দিয়ে, আরও ওপরে ওঠার প্রস্তুতি নিই। কিছুদূর যেতেই বাধা হয়ে দাঁড়ালো শত শত টাইগার জোঁকের ঝাঁক। গাইডের পরামর্শে দুঃসাহস বাদ দিয়ে, বরং আমরা চললাম পানবাগিছার ডর। বন্ধুর পথ পারি দিয়ে পৌঁছে যাই পানবাগিছার ডর ঝরনার কাছে। খুবই শান্তভাবে অবিরাম ধারায় রিমঝিম ছন্দ তুলে স্বচ্ছ টলটলে পানি বয়ে যায় আপন মনে। ঝরনার পরিবেশটা কেন যেন শান্ত শান্ত মনে হলো। ঝরনাটির নামের শেষে ডর। সত্যিই সব অদ্ভুত ব্যাপার । পানবাগিছার ডর ঝরনার সান্নিধ্যে এসে আমরাও কেমন যেন শান্ত হয়ে উঠেছিলাম। চুপচাপ ঝরনা দেখছিলাম। টিপটিপ বৃষ্টি। জোঁকের উপদ্রবও বেড়ে গেল কয়েকগুণ। এ রকম অবস্থায় ঝোপঝাড় পেরিয়ে পাহাড় ট্র্যাকিং কষ্টসাধ্য। অনেক কষ্টে সঞ্জীত ঝরনার কাছে পৌঁছে যাই। তাই কাছ থেকেই ফিরে না এসে পাহাড়ের ওপর থেকে কিছুটা নিচে নেমে, সঞ্জীত ঝরনার পানিতে নিজেদের ডুবিয়ে দিই। কিছুটা সময় পেরুতেই মায়া জালে আটকে গেলাম। অলসভাবে বসে থাকতে থাকতে সন্ধ্যা নেমে এলো। এবার ছুটলাম আরেক পাহাড়ের ওপর থাকা জুমঘরে। রাতটা সেখানেই কাটাবো। সেখানে পৌঁছে অবস্থা সঙ্গীহীন। গত এক বছর কেউ এখানে রাত কাটিয়েছে মনে হয় না । কিছু করার নেই। লোকালয়ে ফেরারও কোনো সুযোগ নেই। ভয়ংকর রাত যাপনের অভিজ্ঞতা ভ্রমণ ঝুলি সমৃদ্ধ করল। পাখি ডাকা ভোরে আশপাশের নৈসর্গিক পরিবেশ মন শান্ত করে দিল। এবার আতর বাগান ছাড়িয়ে কাকড়া ছড়া ঝরনার প্রান্তরে। হাইকিং ট্র্যাকিং করতে করতে ঢুকে যাই বুনো এক ঝিরিতে। ওয়াও! একের পর এক পাথারিয়ার পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা নানান সৌন্দযর্, চোখে ধরা দিয়েই যাচ্ছে। প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়। ঝিরিপথে দু’পাশের গাছে ঢাউস সাইজের পাকা ডুমুর।  অন্যান্য ঝিরির চেয়ে কাকড়া ছড়া ঝিরির পাথরগুলোও বেশ বড় ও গোলাকার। এমনি নজরকাড়া ঝিরিপথ ধরে যেতে যেতে কাকড়া ছড়া ঝরনার প্রান্তরে হাজির। প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ। হুট করেই মেঘের গর্জন এবং বৃষ্টির আশঙ্কায় দ্রুত ফিরতি পথ ধরি।