ইরানের সঙ্গে প্রায় ৭ মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ-প্রতিনিধি পরিষদ। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে গত মঙ্গলবার একটি ওয়ার পাওয়ার্স রেজল্যুশন বা যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাব অনুমোদন করেছে প্রতিনিধি পরিষদ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ ধরনের ব্যবস্থার ওপর এটি প্রতিনিধি পরিষদের তৃতীয় ভোট। সিএনএন জানিয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা যোগ দেওয়ায় প্রস্তাবটি ২২০-২০৪ ভোটে পাস হয়। কংগ্রেসের এই আইনগত উদ্যোগের পেছনে রয়েছে কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন, যেখানে প্রাক্কলন করা হয়েছে যে গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এ পর্যন্ত ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হয়েছে এবং প্রতি মাসে ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় বাড়ছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, দীর্ঘস্থায়ী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী অস্ত্রের মজুদকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে, যা কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।
আগের দুটি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে মাত্র চারজন রিপাবলিকান ভোট দিলেও, এবার সাতজন রিপাবলিকান এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রথমবারের মতো সমর্থন দিয়েছেন আইওয়া অঙ্গরাজ্যের দুই প্রতিনিধি ম্যারিয়ানেট মিলার-মিকস ও জ্যাক নান এবং সাউথ ক্যারোলাইনার ন্যান্সি মেস যিনি চলতি মেয়াদের পর কংগ্রেস ছাড়ছেন। এর আগে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়া চারজন রিপাবলিকান হলেন কেন্টাকির থমাস ম্যাসি, মিশিগানের টম ব্যারেট, ওহাইওর ওয়ারেন ডেভিডসন এবং পেনসিলভানিয়ার ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক।
কংগ্রেস একাধিকবার যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। চলতি বছর জুনে প্রথম এমন একটি প্রস্তাব পাস হয়, জুলাই মাসে দ্বিতীয়টি। এমনকি সিনেটেও দীর্ঘ চেষ্টার পর দশমবারের প্রয়াসে একটি অনুরূপ প্রস্তাব পাস হয়েছিল, তবে ট্রাম্পের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পরই রিপাবলিকান সিনেটররা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেন। তবে বাস্তবতা হলো, ট্রাম্প এসব প্রস্তাব আটকানো বা ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখায় কংগ্রেসের এই প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা এখনো সীমিত। প্রস্তাবটি এগিয়ে নেওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি এবং সাবেক মেরিন সেনা শেঠ মল্টন স্মরণ করিয়ে দেন, একসময় ট্রাম্প নিজেই দাবি করেছিলেন এই যুদ্ধ মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। তিনি মন্তব্য করেন, সংবিধান অনুযায়ী কংগ্রেসের এখন কঠিন প্রশ্ন তোলা উচিত, আরেকটি যুদ্ধপ্রবণ প্রশাসনের কাছে নতিস্বীকার করা নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে থাকলেও, প্রেসিডেন্টকে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে কিছু সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর প্রণীত ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ এই প্রেসিডেনসিয়াল ক্ষমতার ওপর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করে এই আইন অনুযায়ী ৬০-৯০ দিনের বেশি কোনো সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে বাস্তবে এই সীমাবদ্ধতা কার্যকর করা সবসময়ই একটি জটিল রাজনৈতিক লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
চীন সফরে আরাগচি : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে চীন সফরে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। গতকাল বুধবার বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর বেইজিংয়ে এটি আরাগচির দ্বিতীয় সফর। এবারও তিনি ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পরিকল্পিত বৈঠকের ঠিক আগে দিয়ে দেশটিতে যাচ্ছেন। এ মাসের শেষ দিকে ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-শি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
সংঘাত নিরসনে চীন নিজেদের নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনেও শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানে বিশ্বনেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এবং এ বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। চীনের প্রেসিডেন্ট উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা কমাতে চার দফা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। এ পরিকল্পনার মূল বিষয় হলো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।