প্রতারণায় বিপর্যয় নেমে আসে

ইসলামের বেশকিছু অকাট্য মূলনীতিগুলো রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, সব ক্ষেত্রে মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করা, সব ধরনের আচরণ ও লেনদেনে সত্যবাদী থাকা এবং সব ক্ষেত্রে আমানত রক্ষা করা। এই নীতির ভিত্তিতেই ইসলামি শরিয়ত প্রতারণার সব রূপ ও পদ্ধতি নিষিদ্ধ করেছে।

প্রতারণার এমন অনেক নিন্দনীয় ও ক্ষতিকর রূপ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, যা তাদের খাদ্য, পানীয়, পোশাক, যানবাহনসহ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায়। এর ধরন এত বেশি যে তা গণনা করে শেষ করা যায় না। এর ক্ষতি ও দুর্ভোগও অনেক। এটি বড় ধরনের খেয়ানত, ভয়াবহ অপরাধ এবং পৃথিবীতে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টির অন্যতম কারণ।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের সঙ্গে খেয়ানত করো না এবং জেনে শুনে নিজেদের আমানতের সঙ্গেও খেয়ানত করো না।’ (সুরা আনফাল ২৭) তিনি আরও বলেন, ‘দুনিয়ায় শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপনের পর বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করো না।’ (সুরা আরাফ ৫৬) সব ধরনের প্রতারণাই বড় গুনাহ ও গুরুতর অন্যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম)

প্রতারণা ও ধোঁকার মাধ্যমে মানুষের সম্পদ গ্রহণ করা অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণ করার অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পরিমাপ ও ওজন পূর্ণ করো এবং মানুষকে তাদের প্রাপ্য জিনিস কম দিও না।’ (সুরা আরাফ ৮৫)

মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।’ (সুরা নিসা ২৯)

ব্যবসায়িক লেনদেন হোক কিংবা অন্য কোনো লেনদেন, তাতে যেকোনো ধরনের প্রতারণা এমন জুলুম, যা মহান আল্লাহ পছন্দ করেন না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা ওজনে কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন ১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যাকে কোনো জনগোষ্ঠীর দায়িত্বশীল করেছেন, অতঃপর সে তাদের কল্যাণের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেনি, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।’ (সহিহ বুখারি)

জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) সম্পর্কে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি যখন কোনো পণ্য বিক্রির জন্য উপস্থাপন করতেন, তখন সেটার ত্রুটি ক্রেতাকে দেখিয়ে দিতেন। এরপর ক্রেতাকে বলতেন, ‘তুমি চাইলে এটি গ্রহণ করো, অথবা ছেড়ে দাও।’

তাকে বলা হলো, ‘আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। আপনি যদি এভাবে বিক্রি করেন, তবে তো আপনার কোনো পণ্যই বিক্রি হবে না!’ তিনি বললেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে লোকদের জন্য কল্যাণ কামনার অঙ্গীকার করেছি।’ (সহিহ বুখারি)

প্রতারণার শুধু মানুষের অর্থসম্পদ কেড়ে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রতারণার কারণে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। এর মাধ্যমে মানুষের শরীরে দুরারোগ্য রোগ ও প্রাণঘাতী ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মারাত্মক ক্ষতি ও বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। যারা এ ধরনের প্রতারণা করে, তাদের ওপর নানা ধরনের গুনাহ ও জঘন্য কাজের দায় বর্তায়। দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের এসব অপরাধের বোঝা বহন করতে হবে।

মহান আল্লাহ বলেন, মানুষের মধ্যে এমনও আছে, পার্থিব জীবন সম্পর্কিত যার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে, আর সে ব্যক্তি তার অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহকে সাক্ষী রাখে, অথচ সে খুবই ঝগড়াটে। যখন তোমার কাছ থেকে সে ব্যক্তি ফিরে যায়, তখন দেশের মধ্যে অনিষ্ট ঘটাতে এবং শস্যাদি ও পশুগুলোকে ধ্বংস করতে চেষ্টা করে। আর আল্লাহ ফ্যাসাদ পছন্দ করেন না।’ (সুরা বাকারা ২০৪-২০৫)

আয়াতটির অর্থ এ ধরনের প্রতারকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমরা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা ও কল্যাণ প্রার্থনা করি।

১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন

মুফতি আতিকুর রহমান