সরল পথ দুই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৩ এএম

মহান আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে সরল-সঠিক পথের আহ্বানকারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। সরল-সঠিক পথে অবিচল থাকার গুরুত্ব অনেক। এ কারণেই তিনি নামাজের প্রতি রাকাতে এ পথের হেদায়েত চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা নামাজে বলি, ‘ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম’, অর্থাৎ আমাদেরকে সরল-সঠিক পথ দেখান (এবং তাতে অবিচল রাখুন)। সুতরাং যে পথ হারিয়েছে সে আল্লাহর কাছে এই পথে ফিরে আসার প্রার্থনা করে, আর যে এই পথে চলছে সে তার কাছে এর ওপর অবিচল থাকার প্রার্থনা করে। এটিই হলো নবী, রাসুল, সিদ্দীক, শহীদ ও নেককারদের পথ।

সিরাতুল মুস্তাকিম হলো ইসলাম ধর্ম, কোরআন হলো এর নির্দেশক এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন এর ব্যাখ্যাকারী। সুতরাং যে ব্যক্তি তার পথ অবলম্বন করল, তার সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরল, তার হেদায়েত অনুসরণ করল এবং তার দেখানো পথে চলল, সে-ই সরল-সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত রইল।

হে ইমানদার ভাইয়েরা! একজন বান্দা এই পথের ওপর ততক্ষণ পর্যন্ত অবিচল থাকতে পারে না, যতক্ষণ না উপকারী জ্ঞান তাকে পথ দেখায় এবং সৎকর্ম তাকে পরিশুদ্ধ করে। এই সরল-সঠিক পথ দুটি মহান ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এক. আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা এবং কেবল তারই ইবাদত করা। দুই. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করা। সুতরাং যে ব্যক্তি ইবাদতের কোনো অংশ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য নিবেদন করল অথবা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে আল্লাহর ইবাদত করল, সে সরল-সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত ও পথভ্রষ্ট হলো।

মুসনাদে আহমদে ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের জন্য একটি রেখা টেনে বললেন, ‘এটি আল্লাহর পথ।’ এরপর তিনি এর ডানে ও বামে কয়েকটি রেখা টেনে বললেন, ‘এগুলো অন্যান্য পথ। প্রতিটি পথের ওপর একটি করে শয়তান রয়েছে, যে মানুষকে সেই পথে আহ্বান করে।’

এরপর তিনি তেলাওয়াত করলেন, ‘আর নিশ্চয়ই এটাই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা তা অনুসরণ করো এবং অন্য পথ অনুসরণ করো না। তাহলে সেগুলো তোমাদেরকে তার পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। তিনি তোমাদের এ নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো।’ (সুরা আনআম ১৫৩)

হে ইমানদার ভাইয়েরা! এই দুনিয়াতে মহান আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য এমন একটি সরল-সঠিক পথ নির্ধারণ করেছেন, যার মধ্যে কোনো বক্রতা নেই, তেমনি কেয়ামতের দিন তিনি জাহান্নামের ওপর একটি পুল স্থাপন করবেন, যার ওপর দিয়ে মানুষ পার হবে।

সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত কেয়ামতের দিন সুপারিশের দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ককে পাঠানো হবে। তারা উভয়ে পুলের ডান ও বাম পাশে অবস্থান করবে। তোমাদের মধ্যে প্রথম যারা অতিক্রম করবে, তারা বিদ্যুতের মতো অতিক্রম করবে।’

বর্ণনাকারী বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার বাবা ও মা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক। বিদ্যুতের মতো অতিক্রম করবে কীভাবে?’

তিনি বললেন, ‘তোমরা কি দেখনি, বিদ্যুৎ কীভাবে এক মুহূর্তের মধ্যে চলে যায় এবং ফিরে আসে? এরপর বাতাসের মতো, তারপর পাখির মতো এবং এরপর দ্রুতগামী পুরুষদের মতো। তাদের আমল তাদের নিয়ে দ্রুত অতিক্রম করবে। তোমাদের নবী তখন পুলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবেন এবং বলবেন, হে আমার রব! নিরাপদ রাখুন, নিরাপদ রাখুন।’

এভাবে মানুষের আমল দুর্বল হয়ে আসতে থাকবে। একপর্যায়ে এমন একজন ব্যক্তি আসবে, যে হামাগুড়ি দেওয়া ছাড়া আর চলতে পারবে না।

তিনি আরও বলেছেন, ‘পুলের দুই প্রান্তে ঝুলন্ত কাঁটাযুক্ত হুক থাকবে, যাদেরকে ধরার নির্দেশ দেওয়া হবে সেগুলো কেবল তাদেরই ধরবে। ফলে কেউ আঁচড় খেয়ে নিরাপদে পার হয়ে যাবে, আর কেউ হুকের আঘাতে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।’

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেককেই তা অতিক্রম করতে হবে। এটি তোমার রবের অবধারিত সিদ্ধান্ত। এরপর আমি মুত্তাকিদের রক্ষা করব এবং জালেমদের সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দেব।’ (সুরা মারইয়াম ৭১-৭২)

ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, দুনিয়ায় মানুষ মহান আল্লাহর সরল-সঠিক পথে যে গতিতে চলে, কেয়ামতের দিন পুলসিরাতেও তাদের অতিক্রমের গতি সেই অনুযায়ী হবে। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে দ্রুত সরল-সঠিক পথে চলে, সেখানে সে দ্রুত অতিক্রম করবে। যে ব্যক্তি এখানে ধীরে চলে, সেখানে সে ধীরগতিতে অতিক্রম করবে। আর যে ব্যক্তি এখানে সরল-সঠিক পথে সবচেয়ে বেশি অবিচল থাকে, সেখানে সে সবচেয়ে বেশি দৃঢ় থাকবে। দুনিয়ায় যাকে প্রবৃত্তির আকর্ষণ, সংশয় ও পথভ্রষ্ট বেদয়াতের কাঁটা ছিনিয়ে নিয়েছে, সেখানেও পুলসিরাতের কাঁটাগুলো তাকে ছিনিয়ে নেবে।

হে ইমানদাররা! হেদায়েত অর্জন এবং এর ওপর অবিচল থাকার অন্যতম সহায়ক হলো নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা। মহান আল্লাহ নবীজিকে বলেছেন, ‘আপনি যেভাবে আদিষ্ট হয়েছেন সেভাবে অবিচল থাকুন।’ (সুরা হুদ ১১২)

যদি নবীজি (সা.)-এর ক্ষেত্রেও এভাবে অবিচল থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এর মাধ্যমে বোঝা যায়, সরল-সঠিক পথে অবিচল থাকা মানুষের নিজের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। এর মাপকাঠি হলো কিতাব ও সুন্নাহর অনুসরণ। যে ব্যক্তি কোরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে, আল্লাহ তাকে হেদায়েতের তৌফিক দেন।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘এভাবে আমার নির্দেশের মূল শিক্ষাকে আপনার কাছে আমি ওহি যোগে প্রেরণ করেছি। আপনি জানতেন না কিতাব কী, ইমান কী, কিন্তু আমি একে (ওহি যোগে প্রেরিত কোরআনকে) করেছি আলো, যার সাহায্যে আমার বান্দাহদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছে আমি সঠিক পথে পরিচালিত করি। আপনি নিশ্চিতই (মানুষদের) সঠিক পথের দিকে নির্দেশ করছেন। সেই আল্লাহর পথে, যিনি আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে তার মালিক। জেনে রাখুন, সব বিষয়ই আল্লাহর কাছে ফিরে যাবে।’ (সুরা শুরা ৫২-৫৩)

হে ইমানদাররা! মহান আল্লাহর তৌফিক ছাড়া বান্দা সরল-সঠিক পথের হেদায়েত অর্জন করতে পারে না। তিনি যাকে চান, তাকে হেদায়েতের মাধ্যমে সম্মানিত করেন। মহান আল্লাহ, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ইমানদারদের সরল-সঠিক পথের দিকে পথনির্দেশ করেন।’ (সুরা হজ ৫৪)

মহান আল্লাহ যাকে হেদায়েত দিতে চান, তাকে হেদায়েত দেন। যেমন তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ যাকে চান তাকে পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান তাকে সরল-সঠিক পথে পরিচালিত করেন।’ (সুরা আনআম ৩৯)

সুতরাং হেদায়েত অর্জন এবং তা বাস্তবায়নের অন্যতম মহান উপায় হলো হেদায়েতের মালিক আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়া এবং তাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে, তাকে অবশ্যই সরল-সঠিক পথের দিশা দেওয়া হবে।’ (সুরা আলে ইমরান ১০১)

সরল-সঠিক পথের হেদায়েত চেয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা সবচেয়ে উপকারী ও মর্যাদাপূর্ণ দোয়াগুলোর একটি। হাদিসে কুদসিতে নবীজি (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি নামাজকে আমার ও আমার বান্দার মধ্যে দুই ভাগে ভাগ করেছি। এর অর্ধেক আমার জন্য এবং অর্ধেক আমার বান্দার জন্য। আর আমার বান্দা যা চাইবে, তা তার জন্য।’

সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, (সুরা ফাতেহায়) বান্দা যখন বলে, ‘আমাদের সরল-সঠিক পথ দেখাও। তাদের পথ, যাদের তুমি অনুগ্রহ করেছ। তাদের পথ নয়, যারা তোমার ক্রোধের পাত্র এবং যারা পথভ্রষ্ট’, তখন আল্লাহ বলেন, ‘এটি আমার বান্দার জন্য আর আমার বান্দা যা চেয়েছে তা তার জন্য।’

হে ইমানদাররা! যে ব্যক্তি ‘আমাদের সরল-সঠিক পথ দেখাও’, এই আয়াতের প্রতি গভীরভাবে চিন্তা করে, সে বুঝতে পারে, সরল-সঠিক পথের হেদায়েত এমন কোনো অবস্থান নয়, যেখানে পৌঁছানোর পর বান্দার আর হেদায়েতের প্রয়োজন থাকে না। বরং সে যে হেদায়েত লাভ করেছে, সেটার ওপর অবিচল থাকার জন্যও তার আল্লাহর সাহায্যের প্রয়োজন রয়েছে।

এ কারণেই নবীজি (সা.) বারবার মহান আল্লাহর কাছে হেদায়েত প্রার্থনা করতেন। অথচ তিনি ছিলেন সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক হেদায়েতপ্রাপ্ত এবং মানুষের মধ্যে সর্বাধিক পরিপূর্ণ।

হে আল্লাহ! ফিলিস্তিনে আমাদের ভাইদের দুঃখ-কষ্ট দূর করুন। তাদের সাহায্যকারী, সমর্থক ও সহায় হোন। জালেমদের অত্যাচার এবং দখলদারদের আগ্রাসন থেকে মসজিদে আকসাকে রক্ষা করুন। একে কেয়ামত পর্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানিত অবস্থায় সুউচ্চ রাখুন। আমরা আপনার কাছে হেদায়েত, তাকওয়া, পবিত্রতা ও অভাবমুক্তি প্রার্থনা করছি।

১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত