তরমুজ চাষে খোর্শেদের সাফল্য

সাধারণত তরমুজ মানেই বাইরে সবুজ, কালো অথবা সবুজের মাঝে ডোরাকাটা খোসা আর ভেতরে টকটকে লাল শাঁস এটাই হলো আমাদের চিরচেনা দৃশ্য।

কিন্তু মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের লাঠিটিলা পাহাড়ের পাদদেশে ভারতীয় সীমান্তবর্তী পাহাড়ি গ্রাম ডোমাবাড়ীতে গণমাধ্যম ও পরিবেশকর্মী খোর্শেদ আলমের তরমুজ বাগানে গেলে এক ঝটকায় বদলে যাবে তরমুজ নিয়ে সেই ধারণা। তার বাগানের তরমুজ কাটলেই দেখা মিলছে হলুদ, কমলা কিংবা ভিন্ন রঙের নজরকাড়া শাঁস। শুধু রঙেই নয়, স্বাদেও এসব তরমুজ সাধারণ তরমুজের চেয়ে অনেক বেশি মিষ্টি ও আকর্ষণীয়। আর এই অভিনব কৃষির পেছনে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে একটি ইউটিউব ভিডিও।

জানা যায়, প্রায় ছয় বছর আগে স্মার্টফোনে ইউটিউবে চীনে হলুদ তরমুজ চাষের একটি ভিডিও চোখে পড়ে তরুণ উদ্যোক্তা খোর্শেদ আলমের। ভিডিওটি দেখেই তার মনে প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ, তাহলে এখানেই কেন এমন তরমুজ আমাদের দেশে চাষ করা যাবে না? সেই ভাবনা থেকেই প্রথম বছরে নিজের বাড়ির পাশে মাত্র ছয় শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে হলুদ তরমুজের বীজ বপন করেন তিনি। প্রথমবারেই প্রায় ২৫০টি ফল পান।

শুরুতে লক্ষ্য ছিল শুধু পরিবারের চাহিদা মেটানো। কিন্তু ফলন ভালো হওয়া এবং ক্রেতাদের ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় খোর্শেদ বুঝতে পারেন, এই তরমুজই হতে পারে তার ভাগ্য বদলের নতুন সম্ভাবনা। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। পরিবেশ ও সংবাদকর্মীর পরিচয়ের পাশাপাশি কৃষিকেও নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছেন খোর্শেদ। ধান কাটার পর বছরের পর বছর পড়ে থাকা জমিগুলোকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন অত্যন্ত লাভজনক তরমুজের বাগান।

বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় প্রায় তিন বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন বিভিন্ন জাতের আধুনিক তরমুজ। তার বাগানে রয়েছে সানগোল্ড, সূর্যডিম, লিয়োনা, রবি ও ল্যানফে জাতের তরমুজ। পাশাপাশি রয়েছে বিদেশি ফল সাম্মাম ও হ্যানিডিউ। জাতভেদে এসব তরমুজের রঙ ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। সানগোল্ড জাতের তরমুজের বাইরেও হলুদ, ভেতরেও হলুদ। সূর্যডিমের খোসা হলুদ হলেও ভেতরের শাঁস লাল। রবি জাতের তরমুজ বাইরে কালো ডোরাকাটা ভেতরে হলুদ। লিয়োনা জাতের তরমুজ বাইরে ডোরাকাটা ভেতরে কমলা রঙের শাঁস। আর ল্যানফে জাতের তরমুজ বাইরে ডোরাকাটা হলেও ভেতরে হলুদ। এসব তরমুজ দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি স্বাদেও বেশ মিষ্টি।

গত বছর শীত মৌসুমে খোর্শেদের জমিতে ছিল নোভেল ও ল্যানফে জাতের তরমুজ। এ তরমুজ চাষে তিনি মোট খরচ করেছিলেন সাড়ে তিন লাখ টাকার মতো। নিজের পরিবারের চাহিদা, আত্মীয়-স্বজন, এলাকাবাসীর মাঝে বিতরণের পর তিনি বিক্রি করেছিলেন সাড়ে আট লাখ টাকার তরমুজ। এতে মাত্র তিন মাসে নিট লাভ হয়েছিল প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। এ বছরও প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আবহাওয়া ও ফলন অনুকূলে থাকলে অন্তত আট থেকে নয় লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

খোর্শেদের এই সাফল্য দেখে উৎসাহিত হয়েছেন স্থানীয় আরও কয়েকজন তরুণ কৃষক। ডোমাবাড়ী গ্রামের সাইদুল ইসলাম ও সিরাজুল ইসলাম বলেন, খোর্শেদের শীতকালীন তরমুজের প্রকল্প দেখে আমাদেরও আগ্রহ তৈরি হয়। পরে আমরা গ্রীষ্মকালীন তরমুজের প্রদর্শনী করি এবং শুরুতেই সফলতা পাই। এবার আরও বড় পরিসরে শীতকালীন তরমুজের প্রকল্প করার পরিকল্পনা করছি আমরা। একই গ্রামের শাহীন আহমদ ও আজাদ মিয়াসহ আরও কয়েকজন কৃষকও খোর্শেদের উদ্যোগে উৎসাহিত হয়েছেন। তারাও শীতকালীন তরমুজ চাষে ঝুঁকতে চান।

এদিকে খোর্শেদের তরমুজের বাগান এখন শুধু কৃষি প্রকল্প নয়, স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের মানুষের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন সিলেট, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ ছুটে আসছেন জুড়ীর গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের ডোমাবাড়ী গ্রামের এই বাগানে। কেউ আসছেন বাগান দেখতে, কেউ আবার পরিবারের জন্য একসঙ্গে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ৫, ১০ কিংবা ১৫টি তরমুজ। দর্শনার্থীদের অনেকেই বলছেন, একই বাগানে বিভিন্ন রঙ ও বৈশিষ্ট্যের এমন তরমুজ দেখা সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো।

খোর্শেদ আলম বলেন, বাগানে প্রতিদিনই মানুষের উপচে পড়া ভিড় হচ্ছে। তরমুজের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম। এখান থেকেই প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ টন পর্যন্ত তরমুজ বিক্রি করা সম্ভব। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এসে বাগান ঘুরে দেখছেন এবং তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন এতে তিনি আরও উৎসাহিত হচ্ছেন।

জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বলেন, উচ্চমূল্যের এসব হাইব্রিড জাতের তরমুজে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’ রয়েছে। জুড়ীর মাটি ও আবহাওয়া এ ধরনের তরমুজ চাষের জন্য বেশ উপযোগী। কৃষি অফিস থেকে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া কৃষকদের সবসময় সহযোগিতা করা হবে।

খোর্শেদ আলমের গল্পটি শুধু ভিন্ন রঙের তরমুজ চাষের গল্প নয়, এটি সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ারও গল্প। যে জমি বছরের পর বছর ধান কাটার পর পড়ে থাকত, সেই জমিতেই এখন ফলছে লাখ টাকার ফসল। ছয় বছর আগে ইউটিউবের একটি ভিডিও দেখে যে স্বপ্নের শুরু, আজ তা রূপ নিয়েছে বাণিজ্যিক কৃষি উদ্যোগে।

প্রযুক্তির জ্ঞান, নতুন কিছু করার আগ্রহ ও কঠোর পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে খোর্শেদ দেখিয়ে দিয়েছেন ইচ্ছা থাকলে পতিত জমিও হতে পারে আয়ের উৎস, আর কৃষিকাজও হতে পারে তরুণদের আত্মকর্মসংস্থানের অন্যতম পথ। তার এই উদ্যোগ এখন জুড়ীর গণ্ডি পেরিয়ে দেশের অন্য তরুণদের জন্যও হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার গল্প।