গবেষণা নাকি বাণিজ্য

পিএইচডি মানে শুধু আরও একটি ডিগ্রি অর্জন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বছরের পর বছর গবেষণা, অনিশ্চয়তা আর নিজের কাজকে বারবার প্রশ্ন করার কঠিন প্রক্রিয়া। একটি গবেষণা প্রশ্ন খুঁজে বের করা থেকে শুরু করে বিদ্যমান জ্ঞান যাচাই, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, গবেষণার নৈতিকতা রক্ষা এবং নতুন জ্ঞান হিসেবে ফল প্রতিষ্ঠা প্রতিটি ধাপেই গবেষককে অতিক্রম করতে হয় কঠোর একাডেমিক পরীক্ষা। গবেষণার ফল প্রত্যাশামতো না আসা, থিসিস বারবার সংশোধন, তত্ত্বাবধায়কের আপত্তি কিংবা নিজের সিদ্ধান্তকে নতুন প্রমাণের মুখে বদলে ফেলা সবই এই পথের স্বাভাবিক বাস্তবতা।

শেষ পর্যন্ত গবেষককে নিজের কাজের মৌলিকত্ব ও নতুন অবদান নিয়ে দাঁড়াতে হয় একাধিক বিশেষজ্ঞের সামনে। তাই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পথ যতটা মর্যাদার, ততটাই দীর্ঘ ও কঠিন। অর্থের সংকট, গবেষণার ব্যয়, মানসিক চাপ, ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে গবেষণার টানাপড়েন, উপযুক্ত তত্ত্বাবধায়ক না পাওয়া কিংবা গবেষণার গতিপথ বদলে যাওয়ার মতো নানা কারণে অনেকেই এই পথ শেষ করতে পারেন না।

অর্থাৎ একটি মানসম্মত পিএইচডি ডিগ্রির জন্য শুধু একজন শিক্ষার্থী ও একটি বিশ্ববিদ্যালয় যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী গবেষণা পরিবেশ, দক্ষ তত্ত্বাবধান, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, অবকাঠামো এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ।

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি ডিগ্রি চালুর অনুমতি দেওয়ার কথা ভাবছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ইতিমধ্যে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে ইউজিসি। এ তথ্য জানার পর শিক্ষাসংশ্লিষ্ট গবেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন দেশে যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোতে কি কঠিন মানদণ্ড পূরণের মতো গবেষণা সক্ষমতা তৈরি করেছে, নাকি উচ্চশিক্ষার বাজারে পিএইচডিও পরিণত হতে যাচ্ছে আরেকটি বাণিজ্যিক ডিগ্রিতে।

যদিও ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে একসঙ্গে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা যাচাই করে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পিএইচডি চালুর জন্য যোগ্যতা ও সক্ষমতার মানদণ্ড নির্ধারণে ইউজিসি কাজ করছে।

তবে শিক্ষাবিদদের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত ইউজিসির পক্ষে কঠোর অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হবে না। আর্থিক ও রাজনৈতিক চাপসহ নানামুখী কারণে শেষ পর্যন্ত ইউজিসির পক্ষে কেবল নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব নয়। যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেওয়ার পরিবর্তে তখন তদবিরের কারণে নিম্ন যোগ্যতা ও মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হতে পারে পিএইচডি ডিগ্রি।

ইউজিসির ২০২২ সালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী ১০০ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৫টিতে গবেষণা খাতে কোনো অর্থই বরাদ্দ ছিল না; অনেক প্রতিষ্ঠানে এই বরাদ্দ ছিল অত্যন্ত নগণ্য। অন্যদিকে বেসরকারি বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় চলছে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) জুলাই ২০২৬-এর তথ্যচিত্রে দেখা গেছে, দেশের অনুমোদিত ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৯টিতে স্থায়ী উপাচার্য নেই। ৯৬টিতে উপ-উপাচার্য এবং ৪৭টিতে কোষাধ্যক্ষ (ট্রেজারার) পদ শূন্য।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাবাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্টিফিকেট বিক্রি করে টাকা ইনকাম করা কিংবা ঢালাওভাবে নম্বর দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

২২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ২০১৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি গবেষণা করে। সেই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টাকা দিলে মেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরীক্ষা পাসের সনদ। ভুয়া সনদের জন্য ৫০ হাজার থেকে তিন লাখ, নিরীক্ষা করানোর জন্য ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা লেনদেন করতে হয়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দেওয়া এবং নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য উপহার ছাড়াও নগদ অর্থের লেনদেন হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এতে বলা হয়, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস ও পরীক্ষা না নিয়ে টাকার বিনিময়ে সনদ দিচ্ছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জনপ্রতি তিন লাখ করে টাকার বিনিময়ে সনদ দিয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে শাখা ক্যাম্পাস নিষিদ্ধ থাকলেও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪০টি পর্যন্ত শাখা ক্যাম্পাস আছে। ইউনিয়ন পর্যায়েও তাদের শাখা রয়েছে। অর্থাৎ অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে টাকা উপার্জনই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু এর মধ্যেও দেশের হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ালেখা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করেছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি চালু করা মানে একটি বিশাল প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দেওয়া। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এরপরও বেসরকারি উচ্চ মানসম্মত হাতেগোনা যে কয়টা বিশ্ববিদ্যালয় আছে, কেবল সেগুলোতে যদি পিএচডির অনুমোদন দেওয়া হয় তা গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। কিন্তু এই মান নিয়ন্ত্রণ করবে কে? মান বলতে যদি তথাকথিত মান হয় তাহলে এর ফল ধ্বংসাত্মক হবে। ইউজিসি যদি কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করতে পারে, তাহলে ঠিক আছে, তা না হলে মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে।

আমাদের দেশের আমলাতন্ত্র ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে পিএইচডি পিপাসা রয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিশ্চয়ই পুরো বিষয়টি শঙ্কার। হার্ভার্ডসহ বিশ্বের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যদি পিএইচডি ডিগ্রি দিতে পারে, তাহলে আমাদের দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন পারবে না এমন প্রশ্ন আসতেই পারে। কিন্তু ‘মূল প্রশ্ন হলো আমরা কি সেই পর্যায়ের ব্যবস্থা ও সক্ষমতা তৈরি করতে পেরেছি? প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কাগজ-কলমে ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও বাস্তবে অধিকাংশেই ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শিক্ষা ও গবেষণা; ডিগ্রি বিক্রি করা নয়। অথচ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক কার্যক্রমের মান ও ডিগ্রি প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এগুলো তদারকি, পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করার মতো সক্ষমতা রাষ্ট্রের আছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

তিনি বলেন, সরকার বছরের পর বছর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন শর্ত পূরণের নির্দেশ দিয়ে আসছে। অনেক ক্ষেত্রেই সেসব বাস্তবায়ন করানো যাচ্ছে না। কোথাও ভর্তি বন্ধের নির্দেশও কার্যকর করা কঠিন হচ্ছে। একই ব্যবস্থার মধ্যে পিএইচডির মতো উচ্চতর গবেষণা কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্ন উঠবেই। পরীক্ষামূলকভাবে এক-দুটি বিশ্ববিদ্যালয়কে সুযোগ দেওয়া হলেও আশঙ্কা থাকে,  সেটি ধীরে ধীরে নিয়মিত হয়ে যাবে এবং পরে অন্যরাও একই সুযোগ দাবি করবে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, এখন আমরা এআই ও প্ল্যাজিয়ারিজমের যুগে আছি। গবেষণা  মৌলিক কি না, অন্যের লেখা বা গবেষণা কপি করা হয়েছে কি না এসব যাচাই করবে কে? রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক চাপ এলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একাডেমিক মানদণ্ডে কতটা অটল থাকতে পারবে,  সেটিও প্রশ্ন। আমাদের দেশে ভালো ফ্যাকাল্টি অবশ্যই আছেন। কিন্তু কয়েকজন ভালো গবেষক থাকলেই হবে না; প্রয়োজন শক্তিশালী, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক একটি ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থা তৈরি না করে পিএইচডির দরজা খুলে দেওয়া হলে উচ্চশিক্ষার মান রক্ষার বদলে ডিগ্রির বাণিজ্যিকীকরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ইউজিসির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত নীতিমালায় এমন কিছু শর্ত রাখা হচ্ছে, যাতে শুরুতে হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই পিএইচডি চালুর সুযোগ পেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমফিল ও পিএইচডি  দেওয়ার সক্ষমতা নির্ধারণে নির্দিষ্ট ‘ক্রাইটেরিয়া’ রাখা হচ্ছে।

 বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের বড় একটি অংশ শিক্ষার্থীদের ফি থেকে আসে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্বল তদারকির মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রি চালু হলে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি, বেশি আয় এবং দ্রুত ডিগ্রি দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। ঝুঁকি তৈরি হবে তখনই, যখন পিএইচডি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মূলত রাজস্ব আয়ের একটি প্রোগ্রাম হয়ে দাঁড়াবে। ভর্তি সংখ্যা বাড়ানো, উচ্চ ফি নেওয়া এবং দ্রুত ডিগ্রি দেওয়ার প্রবণতা যদি গবেষণার মানের ওপর প্রাধান্য পায়, তাহলে পিএইচডির মূল উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে তিনটি জায়গায় ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি

এক. গবেষণার মান : পর্যাপ্ত গবেষণা অবকাঠামো না থাকলে থিসিস মৌলিক হবে না।

দুই. তত্ত্বাবধান : পর্যাপ্তসংখ্যক অভিজ্ঞ ও সক্রিয় গবেষক না থাকলে একজন শিক্ষক একসঙ্গে কতজন পিএইচডি গবেষককে মানসম্মতভাবে তত্ত্বাবধান করবেন তা নিশ্চিত করতে হবে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে। তিন. থিসিস মূল্যায়ন : বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষক ও প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে গবেষণার মান যাচাই কতটা স্বাধীন থাকবে? এ অবস্থায় বাইরের যোগ্য গবেষকদের মূল্যায়ন ব্যবস্থায় রাখতে হবে।

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার সুযোগ পাবে না। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও সক্ষমতা থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে এ সুযোগ দেওয়া হবে। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ যাতে না ওঠে, সে জন্য গবেষণার মান নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হবে।

অধ্যাপক মামুন বলেন, দেশে যোগ্য শিক্ষক ও গবেষকের সংকট রয়েছে। এ সংকট কাটাতে পিএইচডি ডিগ্রি ও পোস্ট ডক্টরাল গবেষণার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।