৪০০ বছরের ‘গুড়পুকুরের মেলা’ এবারও হচ্ছে না

বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা প্রকৃতি আর সুন্দরবনের লোকগাথায় সমৃদ্ধ সাতক্ষীরার আত্মিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শত শত বছরের লৌকিক আচার ও সংস্কৃতি। ভাদ্রের বিদায় আর আশ্বিনের আহ্বানে প্রতি বছরের মতো এবারও বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় শহরজুড়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ‘বিশ্বকর্মা’ ও ‘মনসা পূজা’। তবে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পূজা অনুষ্ঠিত হলেও সাতক্ষীরাবাসীর মনে রয়ে গেছে আক্ষেপের ছাপ; পৌরসভার উদ্যোগ না থাকায় মনসাতলার মূল প্রাঙ্গণে এবারও বসেনি প্রায় ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘গুড়পুকুরের মেলা’।

গতকাল শুক্রবার সকালে শহরের পলাশপোলের গুড়পুকুর পাড়ের বটতলা মনসাতলায় মনসাতলা মন্দির কমিটির আয়োজনে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা ধর্মীয় রীতি অনুসারে মায়ের কৃপা ও দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আশীর্বাদ কামনায় প্রার্থনায় মিলিত হন। পূজার দায়িত্বে থাকা পুরোহিত তাপস চক্রবর্তী বলেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় শত শত বছর ধরে এখানে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। অলংকার ও শিল্পকলার দেবী হিসেবে মা মনসা ও বিশ্বকর্মার কৃপা লাভে শত শত মানুষ এখানে সমবেত হন।

মূলত ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে (ভাদ্রের শেষ দিন) এ পূজা উদযাপিত হয়। তবে বাংলাদেশে বর্ষপঞ্জি সংস্কারের কারণে দিনটি এবার ৩ আশ্বিনে পড়েছে। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে একদিনেই। মেলার আয়োজন না হওয়ার উৎসবের রেশও শেষ হয়ে গেছে। অথচ আগে এই মেলা অনুষ্ঠিত হতো মাসব্যাপী। 

সাতক্ষীরা শহরের প্রধান আকর্ষণ এই মেলা ও পূজার উৎপত্তির নেপথ্যে রয়েছে পৌরাণিক বিশ্বাস এবং সম্প্রীতির দীর্ঘ ইতিহাস। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, বাংলা ১২ শতকের শেষের দিকে সুলতানি আমলে বাগেরহাটের বিখ্যাত সুফি সাধক হজরত খানজাহান আলীর (র.) খাজাঞ্চি কামদেব ও জয়দেব রায় চৌধুরী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে কামালউদ্দিন ও জামালউদ্দিন নাম ধারণ করেন। তাদেরই উত্তরসূরি বুড়া খাঁ বাগেরহাট থেকে এসে পলাশপোলে বসতি স্থাপন করেন এবং চৌধুরীবাড়ি গড়ে তোলেন। পরে ভাদ্রের এক শেষ দুপুরে চৌধুরীবাড়ির অন্যতম উত্তরসূরি ফাজেল খাঁ চৌধুরী খাজনা আদায় শেষে গুড়পুকুর পাড়ের বুড়ো বটের ছায়ায় ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এ সময় তীব্র রোদের তাফাল থেকে তাকে রক্ষা করতে একটি বিষধর পদ্মগোখরা সাপ ফণা তুলে ছায়া বিস্তার করে। ঘুম ভাঙার পর সাপের এই অলৌকিক আচরণ দেখে ফাজেল খাঁ অভিভূত হন এবং স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়কে ডেকে এই বটতলায় মনসা পূজা শুরু করার আহ্বান জানান। সেই থেকে ৩১ ভাদ্র শুরু হওয়া মনসা পূজাই কালক্রমে বিশ্বকর্মা পূজা ও গুড়পুকুর মেলায় রূপ নেয়।

তবে মেলার নামকরণ নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত আছে নানা গল্প। কেউ বলেন পূজার বাতাসায় পুকুরের পানি মিষ্টি হতো, আবার কারও মতে অলৌকিক স্বপ্নে একশ ভাঁড় গুড় ঢালার পর পুকুরে পানি স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও প্রবীণদের মতে, গৌর বর্ণ রায় চৌধুরীদের এই পুকুরকে একসময় ‘গৌরদের পুকুর’ বলা হতো, যা কালের বিবর্তনে রূপান্তরিত হয়ে ‘গুড়পুকুর’ নামে পরিচিতি পায়।

জানা যায়, একসময় এ মেলাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চল থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গেও সাজ সাজ রব পড়ে যেত। লাবসা থেকে খুলনা রোড হয়ে তুফান কোম্পানির মোড় হয়ে বাকাল আলিপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তবে পলাশপোল স্কুল, নিউমার্কেট মোড়, শহীদ রাজ্জাক পার্ক পর্যন্ত জমজমাট মেলা অঙ্গন। মেলার বিস্তৃতির বিকাশ ছিল বিনেরপোতা হয়ে নগরঘাটা পর্যন্ত। সবখানে ছিল কাঠের আসবাবপত্র, গাছপালা, ইলিশসহ নানা মাছের পসরা, বাতাবি লেবু, আখের সমাহার, মাটির তৈজসপত্র, দা-বঁটি-ছুরিসহ লোহার নির্মিত বিভিন্নপণ্য, নাগোরদোলা, সার্কাস আর বিখ্যাত ‘লাখ টাকার পালংকের’ কথা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের মেলায় বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে তিনজন প্রাণ হারান। আহত হয় দুই শতাধিক মানুষ। এরপর থেকেই কার্যত মøান হয়ে যায় গুড়পুকুর মেলা। তারপরও মেলার অস্থিত্ব টিকে ছিল। প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে কয়েক দিনের জন্য হলেও মেলা অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের পর থেকে এই মেলার আয়োজন একেবারেই বন্ধ। সমাজকর্মী ও সাংবাদিক আব্দুস সামাদ বলেন, ‘বোমা হামলায় কয়েকজনের মৃত্যুর পর নানা সীমাবদ্ধতায় মেলার আয়োজন বাধাগ্রস্ত হয়। তারপরেও জেলা প্রশাসক ও স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় তা টিকে ছিল। কিন্তু এই তিন বছরে একেবারেই নাই হয়ে গেছে মেলাটি। তবে তালার নগরঘাটায় এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছে স্থানীয়রা। ঐতিহ্যবাহী স্থানটিতে মেলার আয়োজন পুনরায় ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।’

প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই গুড়পুকুরের মেলা তার নিজস্ব প্রাঙ্গণে পূর্ণ জৌলুস নিয়ে ফিরুক এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমী সচেতন মহলের।

মেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অবসরপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা কিরণ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘গুড়পুকুরের মেলা কেবল কেনাকাটার মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল এ অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষের মিলনোৎসব। মেলা থেকে মিষ্টিপান, বাতাবি লেবু আর ইলিশ মাছ না কিনে কেউ বাড়ি ফিরত না।’

সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক সমরেশ কুমার দাস আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের শৈশব-কৈশোরের আনন্দ লুকিয়ে ছিল এই গুড়পুকুরের পাড়ে। কালের বিবর্তনে মেলার কলেবর ও রূপ বদলালেও মানুষের আবেগ এখনো একই জায়গায় আটকে আছে।’

রসুলপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক রামু চক্রবর্তী বলেন, ‘মুসলিম জমিদারের আহ্বানে সূচনা হওয়া এ পূজা ও মেলা সাতক্ষীরার অসাম্প্রদায়িক চেতনার সবচেয়ে বড় দলিল। ইতিহাস আর সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন আমাদের রক্ষা করতেই হবে।’