রঙ ও রেখায় জীবনের গল্প

কোথাও প্রকৃতির নিবিড় সৌন্দর্য, কোথাও মানুষের জীবনযাত্রার টুকরো ছবি। পাহাড়, নদ-নদী, খাল-বিল কিংবা আদিবাসী গ্রামের দৃশ্যপট— বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি ও সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে শিল্পীদের ক্যানভাসে। রাজধানীর লালমাটিয়ার গ্যালারি মাফায় গতকাল শুক্রবার শুরু হয়েছে বার্ষিক চিত্র প্রদর্শনী ‘চিত্রমেলা ২০২৬’। জলরঙ, অ্যাক্রেলিক, পেন্সিল স্কেচ, পেন স্কেচ, তেলচিত্র ও প্যাস্টেল মাধ্যমে আঁকা শিল্পকর্ম নিয়ে সাজানো হয়েছে এ প্রদর্শনী।

জলেরধারা ফাইন আর্টসের ১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত প্রদর্শনীতে নবীন ও প্রবীণ ৮১ জন শিল্পীর ৮১টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। শিল্পীদের সৃষ্টিকর্মে ফুটে উঠেছে তাদের নিজস্ব ভাবনা, জীবনবোধ ও সৃজনশীলতার বৈচিত্র্য।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী বীরেন সোম, বহুমাত্রিক লেখক, শিল্পসংগ্রাহক ও দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী অধ্যাপক কাওসার হাসান টগর, চিত্রশিল্পী অধ্যাপক মোস্তাফিজুল হক ও চিত্রশিল্পী সালমা শিরিন। জলেরধারা ফাইন আর্টসের পরিচালক ও চিত্রশিল্পী সোহাগ পারভেজও বক্তব্য দেন।

নিজের শিক্ষার্থী জীবনের স্মৃতি তুলে ধরে বীরেন সোম বলেন, ‘চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময় শিক্ষক আমিনুল ইসলাম তাদের মেমোরি ড্রইংয়ের একটি বিশেষ কৌশল শেখান। ২০ মিনিট মডেল পর্যবেক্ষণের পর মডেল সরিয়ে দিয়ে স্মৃতি থেকে আঁকার অনুশীলন করাতেন তিনি। এই দক্ষতা থাকলে সংবাদপত্র বা সাময়িকীতে ইলাস্ট্রেটর হিসেবে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আমিনুল ইসলাম তাদের বলতেন। এই অনুশীলন তার পেশাজীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’

তিনি ২২ বছর দৈনিক সংবাদে চিফ ইলাস্ট্রেটর এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে চিফ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তার বর্তমান অধিকাংশ কাজও মেমোরি ড্রইংনির্ভর। তরুণ শিল্পীদের নিয়মিত স্কেচিং, ফিগার ড্রইং ও মেমোরি ড্রইং অনুশীলনের পরামর্শ দেন তিনি।

দেশ রূপান্তর সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, ‘জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। আসলে সকলেই শিল্পী নয়, কেউ কেউ শিল্পী। সবাই কিন্তু শিল্পী হবেন না, সবার পক্ষে শিল্পী হওয়া সম্ভবও নয়। কিন্তু আমরা যদি শিল্পসত্তা ছড়িয়ে দিতে পারি, শিল্পের একটা আবহ যদি দেশের মধ্যে, সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারি, তাহলে যে শান্তি বিরাজ করবে, সেটাই সবাইকে শান্তিতে রাখবে।’

বর্তমান বাস্তবতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন একটা অস্থির সময়ে বসবাস করছি। এই সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হওয়া উচিত শিল্প। শিল্পে যদি আশ্রয়টা দিতে পারি, তাহলে আমরা শান্তিতে থাকব। আমি মনে করি, আমরা ব্যক্তিগতভাবেও যদি শান্তিতে থাকি, এই ব্যক্তির শান্তিটা কিন্তু তার পরিবারকে প্রভাবিত করে। পরিবার সমাজকে প্রভাবিত করে, সমাজ তার অঞ্চলকে প্রভাবিত করে এবং একসময় এই শান্তি রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করে।’

১৬ বছরের পথচলাকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, “জলেরধারা সৃজনশীলতা নিয়ে কাজ করছে। আমাদের এ রকম অসংখ্য ‘জলেরধারা’ প্রয়োজন।”

কাওসার হাসান টগর বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জলেরধারা যে শিল্প-সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তা প্রশংসনীয়। শিল্পী সোহাগ পারভেজ নিজেও একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করে যাচ্ছেন। তার উদ্যোগের মাধ্যমে শিল্প-সংস্কৃতিকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। একাডেমিক শিক্ষার বাইরে থেকেও যারা শৌখিন শিল্পী হিসেবে কাজ করছেন, সমাজ ও সংস্কৃতিতে তাদের অবদান কোনো অংশে কম নয়।’ নিজের শিল্পচর্চা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভাস্কর্যই আমার প্রধান বিষয়। পাশাপাশি ওয়াটার কালার, অ্যাক্রেলিক ও সিরামিক নিয়ে কাজ করি।’

প্রদর্শনীতে শিল্পের নানা মাধ্যম ও প্রজন্মের সৃজনশীলতার সম্মিলন ঘটেছে উল্লেখ করে জলেরধারার পরিচালক সোহাগ পারভেজ বলেন, “শিল্পীদের পাশাপাশি শিল্পানুরাগীদের অংশগ্রহণে ‘চিত্রমেলা ২০২৬’ আরও আনন্দময় ও অর্থবহ হয়ে উঠেছে।”

প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া বরেণ্য চিত্রশিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন সমরজিৎ রায় চৌধুরী, মনিরুল ইসলাম, অলকেশ ঘোষ, হামিদুজ্জামান খান, বীরেন সোম, মোহাম্মদ ইকবাল, গৌতম চক্রবর্তী, আজহারুল হক শেখ, কারু তিতাস, পারভেজ, শাহানুর মামুন, কামাল উদ্দিনসহ অনেকে।

প্রদর্শনীটি চলবে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত গ্যালারি মাফা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।