ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে ৩ বছরে ৯ লাখ টাকা সাশ্রয়

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ বাজারে অবস্থিত জেবি উচ্চবিদ্যালয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান চলে। ৪৫টি শ্রেণিকক্ষে রয়েছে শতাধিক বৈদ্যুতিক পাখা, প্রায় ১২০টি বাতি, ১২টি কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম। এসব যন্ত্র চালাতে কয়েক বছর আগেও বিদ্যালয়টির মাসিক বিদ্যুৎ বিল গুনতে হতো ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে ছিল বিদ্যুৎ চলে গেলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার সমস্যা। ব্যয় কমানো এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে নির্ভরতা কমাতে তিন বছর আগে বিদ্যালয়ের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেন প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি বড়ুয়া। প্রায় ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১২ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের পর বদলে যায় বিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার চিত্র।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে বৈরী আবহাওয়ার সময় মিরসরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এতে জোরারগঞ্জের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। বিপুল শিক্ষার্থীকে নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের মধ্যে ক্লাস করা এবং প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। ওই পরিস্থিতি থেকেই বিদ্যালয়ের নিজস্ব বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে বর্তমানে ওই বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। শতাধিক পাখা, প্রায় ১২০টি বাতি, ১২টি কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালাতে এ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর বিদ্যালয়ের চাপ যেমন কমেছে, তেমনি বিদ্যুৎ বিলেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের আগে প্রতি মাসে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসত। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায়। অর্থাৎ মাসে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমেছে। বিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত তিন বছরে বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ৯ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্নতার সুবিধাও পাচ্ছে বিদ্যালয়টি।

২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলেও মিরসরাই উপজেলায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে জেবি উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, পাঠদানের অনুকূল পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করছে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পরও সৌরবিদ্যুত থাকায় অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, প্রতিদিন ২ হাজারের মতো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে অবস্থান করে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের আগে বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে স্বাভাবিকভাবে ক্লাসে অংশগ্রহণ কষ্টকর হতো। এখন বিদ্যুৎ চলে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সোলার প্যানেলের বিদ্যুৎ একটিভ হয়ে যায়। ফ্যান বাতি বন্ধ হয় না। এতে ক্লাস করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে শিক্ষার্থীরা।

জেবি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি বড়ুয়া বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের আগে বিদ্যালয়ের মাসিক বিদ্যুৎ খরচ ছিল ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর পর তা ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। তিনি বলেন, আগে ঘন ঘন লোডশেডিং নিয়ে বিদ্যালয়কে নিয়মিত সমস্যায় পড়তে হতো। এখন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার কারণে সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে।

মিরসরাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফেরদৌস হোসেন বলেন, জেবি উচ্চবিদ্যালয়ের মতো অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে এবং এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। সরকারও নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজন ও সক্ষমতা অনুযায়ী এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয়ও কমানো সম্ভব।

প্রায় ২৪ লাখ টাকার বিনিয়োগে তিন বছরে প্রায় ৯ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের হিসাবটি শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, পরিবেশবান্ধব জ¦ালানি ব্যবহারের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। মিরসরাইয়ের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদে স্থাপিত সৌর প্যানেল এখন প্রতিদিনের পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে। ফলে জেবি উচ্চবিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নবায়নযোগ্য জ¦ালানি ব্যবহারের সম্ভাবনাকেও সামনে নিয়ে এসেছে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।