খাটের নিচ থেকে সুবিশাল অফিস

খাটের নিচে জুতার বাক্সে প্রোডাক্ট জমিয়ে যে স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ রূপ নিয়েছে এক বিশালাকার বাণিজ্যিক সামাজ্যে। ‘স্কাই বাই বিডি’র সিইও রাসেল বিন আহাদ-এর গল্পটি কেবল এক তরুণ উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত উত্থান নয়, বরং এটি আত্মবিশ্বাস, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং টানা ১৩ বছরের নিরলস সংগ্রামের এক অবিশ্বাস্য নিদর্শন।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় চাইনিজ বন্ধুদের সহায়তায় নিজের জন্য কিছু পণ্য এনেছিলেন রাসেল। পরিচিতদের আগ্রহ দেখে ভালো লাগা থেকেই শুরু হয় ‘ইমপোর্টেড প্রোডাক্ট বিডি’ নামের ফেসবুক পেজ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় হোলসেল মার্কেট প্লেসগুলোর ব্যাপক সাড়া দেখে তিনি বুঝতে পারেন এর বাজার সম্ভাবনা কত বিশাল।

পড়াশোনা শেষে ছয়টা পর্যন্ত ব্যাংকের চাকরি ও ছয়টার পর ধানম-ির দুই রুমের অফিসে ব্যবসাকে সময় দেওয়াÑ দুই-ই সামলাচ্ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে ব্যবসা থেকে ভালো আয় আসা শুরু করলে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পরিবারকে বিষয়টি জানানোর সাহস পাননি। প্রায় এক বছর ধরে প্রতিদিন স্যুট-টাই পরে ঠিকই বাসা থেকে বের হতেন কিন্তু যেতেন ব্যাংকের বদলে নিজের অফিসে। এক বছর পর ব্যাংক থেকে আসা এক চিঠিতে মা জানতে পারেন ছেলে চাকরি ছেড়েছে অনেক আগেই।

চাকরি ছাড়ার পর পরই শিপিং কোম্পানির ভুলের কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হন রাসেল। ক্লায়েন্টদের টাকা ফেরত দিতে নিজের কষ্টের ডিপিএস পর্যন্ত ভেঙে ফেলেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন যে, চাকরির দিকে আর কখনো ফিরবেন না। ব্যবসায় নতুন মোড় আসে যখন নিজস্ব সাপ্লাই চেইন গড়ার লক্ষ্যে তিনি চীনে নিজস্ব টিম গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। সাংহাই ইউনিভার্সিটি থেকে সাপ্লাই চেইনে পড়াশোনা করা চাইনিজ তরুণী ‘লোনা’কে ভালো বেতনের চাকরি ছেড়ে স্কাই বাই বিডিতে ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দিতে রাজি করান।

ঢাকায় ১২,০০০ স্কয়ার ফিটের হেড অফিস, বাংলাদেশে ৭০ জন এবং চায়নাতে ১৩ জন স্থায়ী কর্মী নিয়ে স্কাই বাই বিডি আজ এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছেছে। আলিবাবার চাইনিজ ভার্সন ওয়েবসাইটে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে পরপর দুবার সর্ববৃহৎ ক্রেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি সপ্তাহে ৩টি ‘বাই এয়ার’ শিপমেন্টে ১৮ টনের বেশি এবং প্রতি শুক্রবারে ‘বাই সি’ ৪০ ফিটের হাই কিউ কনটেইনারে ১৫ থেকে ২০ টন মালামাল চীন থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। সুচ থেকে শুরু করে ভারী মালবাহী গাড়িÑ সবকিছু আমদানির সুবিধা নিশ্চিত করে রাসেল আজ ৩ লাখের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীকে পথ দেখাচ্ছেন এবং ৫০০-এর বেশি নতুন উদ্যোক্তা গড়ে তুলেছেন।

চাকরির নিরাপদ গণ্ডি পেরিয়ে রাসেল বিন আহাদ প্রমাণ করেছেন যে, সততা, দূরদর্শিতা ও অদম্য ইচ্ছা থাকলে খাটের নিচ থেকে শুরু করা ছোট উদ্যোগও আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের নাম উজ্জ্বল করতে পারে।