স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেছেন, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬-এ অভিবাসী চোরাচালানকে পৃথক ও স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেজন্য মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের মধ্যে পার্থক্য যথাযথভাবে চিহ্নিত করে অপরাধের ধরন অনুযায়ী কার্যকর তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সিনিয়র সচিব আজ শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমনে নতুন আইন ২০২৬ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সিলেট বিভাগীয় কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং ব্রিটিশ হাইকমিশন ও জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার, বাংলাদেশের সহযোগিতায় আয়োজিত কর্মশালায় অভিবাসী চোরাচালান, ভিসা ও কাগজপত্র জালিয়াতি, অপরাধী চক্র শনাক্তকরণ, ভুক্তভোগী সুরক্ষা এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সিনিয়র সচিব বলেন, অনিয়মিত পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করা প্রত্যেক ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। অনেকেই প্রতারণা, শোষণ বা মানবপাচারের শিকার হতে পারেন। তাই অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের শনাক্ত, সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, অভিবাসী চোরাচালান একটি সংঘবদ্ধ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় শুধু সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো যথেষ্ট নয়; ভিসা ও কাগজপত্র জালিয়াতি, দালাল ও মধ্যস্থতাকারী এবং এর পেছনে থাকা বৃহত্তর অপরাধী চক্র শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট রেঞ্জের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসাইন, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার সরওয়ার মুর্শেদ শামীম, সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনের এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের রিটার্নস অ্যান্ড রিইন্টিগ্রেশন ম্যানেজার প্রিয়া বাধান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক ও বহিরাগমন) ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন। তিনি নতুন আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ে আইনটির প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর উইংয়ের সলিসিটর সানা মো. মাহরুফ হোসাইন নতুন আইনের বিভিন্ন বিধান তুলে ধরেন। জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার, বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম অভিবাসী চোরাচালানের অপরাধ ও সম্ভাব্য ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ এবং তদন্তের ব্যবহারিক দিক তুলে ধরেন।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মসংস্থান ও অভিবাসনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন অপরাধী চক্র প্রতারণামূলক নিয়োগ, ভুয়া ভিসা ও কাগজপত্র এবং অবৈধ পথে বিদেশে পাঠানোর মতো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এসব অপরাধের প্রকৃতি ক্রমেই জটিল ও আন্তঃদেশীয় হয়ে উঠছে। ফলে শুধু পৃথক ঘটনা মোকাবিলা না করে সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক লেনদেন, মধ্যস্থতাকারী এবং সীমান্তপারের যোগসূত্র চিহ্নিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
নতুন আইনের কার্যকর বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, ইমিগ্রেশন, তদন্তকারী সংস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বিত পদক্ষেপ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কর্মশালায় নতুন আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিধান, বিশেষ করে অভিবাসী চোরাচালান, সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ সংঘটন, ভিসা ও কাগজপত্র জালিয়াতি এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধ নিয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি অভিবাসী চোরাচালানের ঘটনা ও সম্ভাব্য ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ এবং তদন্তের ব্যবহারিক পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হয়।
কর্মশালার উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা মাঠপর্যায়ে অভিবাসী চোরাচালান শনাক্তকরণ ও মোকাবিলার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য পাওয়া, সম্ভাব্য ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ, দালাল ও মধ্যস্থতাকারীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, ভিসা ও কাগজপত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়গুলো আলোচনায় আসে।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা নতুন আইনের আলোকে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান মোকাবিলায় বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ, আন্তঃসংস্থা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও সহায়তার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে মতামত দেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মশালা নতুন আইনটির মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন এবং বিশেষ করে অভিবাসী চোরাচালান মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের চলমান প্রচেষ্টার অংশ।