বিরোধী দলের নজর ঢাকায়

ঢাকা থেকে রংপুরের পথে লংমার্চ করে এবার ঢাকামুখী কর্মসূচির বার্তা দিল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। গতকাল শনিবার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে শুরু হয়ে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধার বিভিন্ন স্থানে পথসভা করে রংপুর জিলা স্কুলে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয় এই লংমার্চ। পথে জোটের শীর্ষ নেতারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ-গ্যাস-সার সংকট নিরসন, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধসহ আট দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর কথা বলেন। দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও কঠোর করার হুঁশিয়ারিও দেন তারা। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে আট দফা প্রয়োজনে এক দফায় রূপ নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকামুখী বড় কর্মসূচির ইঙ্গিত আসে।

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলোর নেতাকর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে অবস্থান নেন। আট দফা দাবিসহ নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চার পাশ। উদ্বোধনী সমাবেশ শেষে সকাল ৮টার দিকে রংপুরের উদ্দেশে ঢাকার অংশ ছাড়ে লংমার্চের বহর।

উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ জোটের শীর্ষ নেতারা। শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের গণদাবি মেনে নিতে হবে। দাবি আদায়ে কোনো চোখরাঙানিকে পরোয়া করা হবে না। একই সঙ্গে ১১ দলের আট দফা দাবি জাতির প্রয়োজনে যেকোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে বলে জানান তিনি। নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসে জনগণের অধিকার হরণ ও গণতন্ত্র ধ্বংস করছে। লংমার্চের ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে গণজোয়ার ঠেকানো যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এরপর গাজীপুরের ভোগরা বাইপাসে সকাল পৌনে ১০টার দিকে প্রথম পথসভা হয়। গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক মুহাম্মদ জামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ডা. শফিকুর রহমান। বক্তব্য দেন জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপিসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা। সঞ্চালনা করেন জামায়াত মনোনীত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী ড. হাফিজুর রহমান।

শফিকুর রহমান বলেন, এ লংমার্চ কোনো দলীয় দাবি আদায়ের জন্য নয়; জনগণের দাবি আদায়ের জন্য। ৭০ ভাগ মানুষ গণভোটের রায় দিয়েছিলেন, কিন্তু সরকার সেটি বাস্তবায়ন না করে অপমান করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। জনগণের রায় বাস্তবায়নে বিএনপিকে বাধ্য করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন। চাঁদাবাজি বন্ধ, দুর্নীতিমুক্ত দেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, আট দফা দাবি নিয়ে নামলেও জনগণের প্রয়োজনে তা যেকোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে।

এরপর গাড়িবহর যায় টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ বাইপাসে। টাঙ্গাইল জেলা জামায়াতের আমির আহসান হাবীব মাসুদের সভাপতিত্বে পথসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ডা. শফিকুর রহমান। বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতারা।

মামুনুল হক বলেন, সরকার জনগণের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হলে ১১ দল সেই ভাষায় কথা বলতে প্রস্তুত। ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের দাবিতে গণভোট দিয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, সেই সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে সংবিধান সংশোধনের নামে জনগণের গণরায়কে অসম্মান করা হলে পরিণাম অতীতের মতোই হবে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা একটি স্বৈরাচারকে হটিয়েছি, এখন নতুন স্বৈরাচার গজিয়ে উঠেছে বাংলাদেশে। গত সাত মাসে জনগণের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস বন্ধ এবং বৈষম্য দূর করার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেন নাহিদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই লড়াই জনগণের জন্য, ১৮ কোটি মানুষের জন্য। জনগণের দাবি আদায় করে ঘরে ফিরবেন তারা। ৭০ শতাংশ ভোটের রায় কেন বাস্তবায়ন করা হলো না, ১৪শ শহীদের রক্তের সঙ্গে কেন বেইমানি করা হলো এ প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। তিনি বলেন, সব দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই হবে। জনগণের প্রয়োজনে আট দফা আরও বাড়তে পারে, আবার সব দফা বিলুপ্ত করে এক দফার ঘোষণাও আসতে পারে।

টাঙ্গাইলের পর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল গোলচত্বরে পথসভা হয়। দুপুর দুইটার দিকে সেখানে পৌঁছান ডা. শফিকুর রহমান। সিরাজগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ মো. শাহিনুর আলমের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম, মিয়া গোলাম পরওয়ার, জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, জাগপার সহ সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, নুরুল ইসলাম বুলবুল, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মামুনুল হক ও এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জুসহ জোটের নেতারা।

শফিকুর রহমান বলেন, কাঠফাটা রোদের মধ্যে আপনাদের দাঁড়িয়ে থাকাই প্রমাণ করে আট দফা দাবি আদায়ে আপনারা প্রস্তুত। আট দফা দাবি না মানলে এক দফার জন্য প্রস্তুত হতে বলেন তিনি। তার ভাষায়, ‘দেখা হবে রাজপথে, ইনশাআল্লাহ।’ গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ৭ দফা দাবিতে ঢাকা থেকে রংপুরের এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তিনি অভিযোগ করেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বিএনপি জনগণের সঙ্গে বেইমানি ও প্রতারণা করেছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে ধোঁকাবাজি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দখলদারি, চাঁদাবাজি, লুটপাট ও সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলে জনগণের গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করার কথা বলেন তিনি।

শনিবার সকাল থেকেই সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে মিছিল নিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন নেতাকর্মীরা। দুপুরের মধ্যে জনসভাস্থল পূর্ণ হয়ে যায়।

সিরাজগঞ্জের পর বগুড়ার শেরপুরে পথসভা হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও ট্রাকচালক পথে পথে চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। পঞ্চগড় থেকে ট্রাক নিয়ে যাত্রা শুরু করলে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা দিতে হয়, না দিলে হামলার শিকার হতে হয়। চাঁদাবাজি চলতে দেওয়া হবে না বলেও ঘোষণা দেন তিনি। ভোটের আগে এক কথা বলে ভোটের পরে আরেক কথা বলা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা বলেও মন্তব্য করেন। দাবি মেনে নেওয়া না হলে ঢাকা-রংপুরের পর পঞ্চগড় থেকে ঢাকার দিকে আরও বড় লংমার্চ হবে বলে জানান তিনি। জনগণের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষণাও দেন।

বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়া শহরের মাটিডালি বিমান মোড়ে পথসভা শুরু হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আট দফা দাবি মানা না হলে এক দফার আন্দোলনে যেতে হবে। এবার লংমার্চ হয়েছে ঢাকা থেকে রংপুরের দিকে; আগামী লংমার্চ হবে পঞ্চগড় থেকে ঢাকার দিকে। এ জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

তিনি বলেন, জনগণকে অপমান করা না হলে আজ লংমার্চ করার প্রয়োজন হতো না। ৭০ ভাগ জনগণ গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে ভোট দিয়েছে দাবি করে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, চাকরিতে বৈষম্য, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, সার ও বিদ্যুৎ সংকটের কথাও তুলে ধরেন।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকার জায়গায় জায়গায় প্রশাসক বসিয়ে মানুষকে শোষণ করছে। কৃষক ন্যায্যমূল্যে সার পাচ্ছেন না, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও ভোগান্তি রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছেড়ে দে’ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যে স্লোগান দিয়েছিলেন, তারা সেটিই দিচ্ছেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতেই লংমার্চ হচ্ছে। জীবন দিয়ে হলেও গণভোটে যে রায় আপনারা দিয়েছেন, সেই রায় বাংলার মাটিতে বাস্তবায়ন করব। আগামীর গণআন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং দখলবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

জামায়াতে ইসলামী বগুড়া মহানগর শাখার আমির অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেলের সভাপতিত্বে পথসভায় আরও বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমেদ, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির আল্লামা আব্দুল মাজেদ আতহারী, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি, এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য বগুড়া অঞ্চলের সহকারী পরিচালক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজি, বাংলাদেশ লেবার পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক ফেরদাউস আলম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মাদ হোসাইন আকন্দ প্রমুখ।

সন্ধ্যার পর লংমার্চের গাড়িবহর পৌঁছায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে। ৭টার দিকে পথসভার মঞ্চে ওঠেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এই লংমার্চ কোনো দল বা ব্যক্তির খায়েশ পূরণের জন্য নয়, ১৮ কোটি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। গণভোটের গণরায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, চাঁদাবাজি-দুর্নীতি বন্ধ, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সারের সংকট নিরসন এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে লংমার্চের প্রয়োজন হতো না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, মায়েরা লাঞ্ছিত, শিশুরা ধর্ষিত ও খুন হচ্ছে। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় জনগণ এই জুলুম আর সহ্য করতে পারছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পথে পথে মানুষ লংমার্চে সমর্থন ও সংহতি জানিয়েছে বলেও জানান।

পথসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াতের রাজনৈতিক সেক্রেটারি ও গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য আবুল কাওছার নজরুল ইসলাম (লেবু মাওলানা)। বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, এলডিপির সভাপতি কর্নেল অলি আহমদ, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাগপার সভাপতি রাশেদ প্রধান, লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান প্রমুখ।