শুধুই কি আইফোন!

দামি আইফোন ছিনিয়ে নিতেই কুমিল্লার স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩) হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় যে চারজনকে আটক করা হয়েছে তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু আইফোন নয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের সঙ্গে পূর্বশত্রুতার কোনো সংযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এ ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার চার্জশিট দেওয়ার হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও আশ্বাস দিয়েছেন, অপ্রতিম হত্যার দ্রুত বিচারে পুলিশ সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে। এদিকে দুই দফা জানাজা শেষে কোটবাড়ি গন্ধমতির বাসার পাশের কবরস্থানে অপ্রতিমকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে।

স্মার্টফোনের প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল কুমিল্লা বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের। প্রযুক্তি ব্যবহারে তার বিশেষ দক্ষতাও ছিল। এই প্রযুক্তি ডিভাইস-ই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াবে তা ভাবতে পারেননি তার অভিভাবকরা। একটি আইফোনের লোভে লালমাই পাহাড়ের গহিন জঙ্গলে নিয়ে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাতে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ১৩ বছরের এই কিশোরটিকে।

গতকাল রবিবার দুপুরে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের নির্মম বর্ণনা দেন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান।

এসপি জানান, গত ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে অপ্রতিমকে ফুঁসলিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে যায় তার পরিচিত সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯)। পরিকল্পনা ছিল নির্জন স্থানে নিয়ে তার হাতের মূল্যবান আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়া। তবে আইফোন ছাড়তে রাজি হয়নি অপ্রতিম। সে বাধা দিলে শুরু হয় ধস্তাধস্তি।

একপর্যায়ে তুহিনের সঙ্গে যোগ দেয় তার দুই সহযোগী মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও কামরুল হাসান। বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে তারা। আঘাতের চোটে রক্তে ভেসে যায় পাহাড়ি নির্জন পথ। কিশোর অপ্রতিমের নিথর দেহ লুটিয়ে পড়লে এবং তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে, রক্তমাখা হাত দিয়েই আইফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় ঘাতকরা।

ঘটনার পর গত ১৮ সেপ্টেম্বর অপ্রতিম নিখোঁজ হলে পরিবার জিডি করে। তদন্তে নেমে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখতে পায়, নিখোঁজের আগে অপ্রতিমের সঙ্গে ছিল তুহিন। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে মৃত্যুর সংবাদ ছড়ানোর আগেই পুলিশ তুহিনকে হেফাজতে নেয়।

পুলিশ সুপার জানান, আটকের পর পুলিশকে নানা ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল তুহিন। ছিনতাই করা আইফোনটি লুকিয়ে রাখা স্থান নিয়ে বারবার মিথ্যা কথা বলে তিন জায়গায় পুলিশকে নিয়ে যায় সে। তবে একটানা কড়া জিজ্ঞাসাবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে তুহিন। স্বীকার করে নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের কথা এবং তার দেখানো মতে নিজ বাড়ি থেকেই পুলিশ উদ্ধার করে অপ্রতিমের সেই কাক্সিক্ষত আইফোনটি।

তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া আরও দুজনকে আটক করে পুলিশ। শিশু আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে তাদের নাম প্রকাশ থেকে বিরত থাকছে দেশ রূপান্তর। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিয়াম (১৯) নামে আরও এক তরুণকে আটক করেছে পুলিশ।

মো. আনিসুজ্জামান বলেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হবে। আমরা আদালতের কাছে আবেদন জানাব, যেন এ ঘটনার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অপ্রতিম হত্যার সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন উঠলে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, কুমিল্লায় এ পর্যন্ত ২৫০ জনের বেশি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় মাদকসেবী, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় মানুষের আধিপত্যের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। একই সঙ্গে লালমাই পাহাড়ে সাম্প্রতিক কয়েকটি অপরাধের ঘটনা এবং অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

পুলিশ সুপার এসব বিষয়ে তদন্তের কথা জানান। তিনি বলেন, লালমাই পাহাড় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ কাজ করছে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন সন্তান কখন, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কখন বাড়িতে ফিরছে এসব বিষয়ে মা-বাবাকে খোঁজ রাখতে হবে। বিশেষ করে অল্প বয়সী সন্তানদের হাতে ফোন ও বিভিন্ন ডিভাইস দেওয়ার ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

অশ্রুজলে শেষশয্যা, ছেলের হত্যার বিচার চাইলেন বাবা : অগণিত মানুষের চোখের জলে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হলো অপ্রতিমকে। গতকাল সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম জানাজা এবং ১১টায় গন্ধমতিতে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তার দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়। জানাজায় ও দাফনে শোকস্তব্ধ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয়রা অংশ নেন।

কোটবাড়ির গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজায় একমাত্র ছেলে হারানো বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, আমার ছেলের বয়স যখন দুই বছর, তখন সে এই এলাকায় এসেছে। অপ্রতিম আপনাদের কাছেই বড় হয়েছে। আপনাদের আদর-স্নেহ পেয়েছে, আপনাদের বাসায় খেয়েছে। তাই আপনাদের কাছেই অপ্রতিমকে সমাহিত করছি।

দাফনের আগে ছেলেকে হারানোর গভীর কষ্টের কথা বলতে গিয়ে ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, আর কাউকে যেন আমার মতো সন্তান হারাতে না হয়। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ কতটা কষ্টের, সেটা আজ বুঝতে পারছি।

তিনি আরও বলেন, আমার ছেলের হত্যার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার চাই। বর্তমান বিচারব্যবস্থার প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে। এই আস্থাটা যেন ব্রেক না হয়। আমার বিশ্বাস, ব্রেক হবে না এবং সুষ্ঠু বিচার হবে।

এরপর কোটবাড়ি গন্ধমতির বাসার পাশের কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে।

মহাসড়ক অবরোধ, শিক্ষার্থীদের চার দফা : দ্বিতীয় জানাজা শেষে অপ্রতিম হত্যার সুষ্ঠু বিচার ও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবিতে চার দফা দাবি জানিয়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীরা। এসব দাবি বাস্তবায়নে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করেন তারা।

মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল শেষে শিক্ষার্থীরা এ ঘোষণা দেন। এ সময় তারা অপ্রতিম হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেন। পাশাপাশি কুমিল্লাসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবি জানান।

শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবি হলো অপ্রতিম হত্যার সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার করে ৬০ দিনের মধ্যে বিচার কার্যক্রম শেষ করে ফাঁসির রায় কার্যকর করতে হবে; পুলিশের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে কুমিল্লার পুলিশ সুপার, আদর্শ সদর ও সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করতে হবে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করতে হবে, প্রয়োজনে সাঙ্গিশ্বর পুলিশ ফাঁড়ি কুবির পাশে স্থানান্তর করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি কুবি এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনতে হবে এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও উদ্ধারে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর বিশেষ ইউনিট গঠন করতে হবে।

কে এই তুহিন : এ হত্যাকাণ্ডের মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯)। সে সদর দক্ষিণ উপজেলার ও  কুমিল্লা সিটি করপোরেশন ২৪ নম্বর ওয়ার্ড সানন্দা গ্রামের (মৈশান বাড়ি) নুরে আলমের ছেলে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তুহিন একসময় অপ্রতিমের বাবার মোবাইল দোকানে চাকরি করতেন। পরে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। সেই চাকরির সূত্রে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঘনিষ্ঠতা। বন্ধু হিসেবে দুজন একসঙ্গে চলাফেরা করতেন তারা। নিয়মিত তাদের বাসায় যাওয়া-আসাও করতেন তুহিন।

দ্বিতীয় আসামির বয়স ১৫। সে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তৃতীয় আসামির বয়সও একই। সে আদর্শ সদর উপজেলার কালিবাজার এলাকার হাতিগাড়া গ্রামের ছেলে। 

আটক চতুর্থজন মো. সিয়াম (১৯)। আদর্শ সদর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের মো. সেলিম মিয়া ছেলে। তিনি আফজাল খান ডিগ্রি কলেজ দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। তারা সবাই তুহিনের বন্ধু।

শুধু আইফোন নয়, আরও যেসব কারণ আলোচনায় : অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শুধু আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াই কারণ নয় বলে ধারণা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। তার দাবি, অপ্রতিম ও আটক তুহিন একসঙ্গে চলাফেরা করতেন এবং তাদের মধ্যে আগে থেকেই কিছুটা বিরোধ ছিল। ওই বিরোধসহ কয়েকটি বিষয় নিয়ে অপ্রতিমকে তুহিন ডেকে নিয়ে হত্যা করে থাকতে পারে।

সাইফুল ইসলাম তুহিন অপ্রতিমের বাবার ফোনের দোকানে চাকরি করে থাকলে সেখানকার কোনো বিরোধ থেকে এই হত্যাকাণ্ড কি না তাও আলোচিত হচ্ছে।

এদিকে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে কুমিল্লার কোটবাড়ি-সালমানপুর এলাকায় নানা আলোচনা চলছে। এ ঘটনায় মাদক সিন্ডিকেট ও কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মাদক সেবনের সময় সালমানপুর এলাকার আট কিশোরকে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। পরে প্রক্টর নাহিদা বেগম তাদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। ওই সময় সালমানপুরের মাদক কারবারি হিসেবে মিলন ও আল আমিনের নাম আলোচনায় আসে। ওই ঘটনার জেরে এলাকার কিশোর গ্যাং ও মাদক চক্রের কেউ কেউ নাহিদা বেগমের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে থাকতে পারেন বলে স্থানীয়দের ধারণা।

পুলিশ এগুলো তদন্ত করছে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছিলেন। তবে এ বিষয়ে এসপি তার ব্রিফিংয়ে কিছু জানাননি।

আদালতে ৩ আসামির স্বীকারোক্তি : অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মামলার প্রধান আসামিসহ তিনজন। গতকাল রবিবার রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবিদা সুলতানা মলির আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় এ জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।

স্বীকারোক্তি দেওয়া আসামিরা হলেন মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) এবং অপর দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণ, যারা স্থানীয় একটি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, অপ্রতিম নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার এবং প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা হয়। ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। পরে তাদের আদালতে হাজির করা হলে তারা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেন।

ঘটনার পূর্বাপর : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার দম্পতির একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। সে কুমিল্লা বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকার নিজ বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে বের হয়েছিল। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। সামাজিক মাধ্যম ও মুন অ্যালার্টের মাধ্যমে দেশজুড়ে অপ্রতিমের সন্ধানে আকুতি জানায় তার পরিবার। নিখোঁজের একদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেট সংলগ্ন বিনোদন পার্ক ‘ম্যাজিক প্যারাডাইস’-এর পাশের সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড়ের গভীরে মিলে তার লাশ। উদ্ধার হওয়া স্থানটি অপ্রতিমদের নিজ বাসা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। প্রথমে নিখোঁজের ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। পরে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন তার বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার।

মৃতদেহ উদ্ধারের পর কুমিল্লা সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার রাতে অপ্রতিমের মরদেহ কোটবাড়ি গন্ধমতির নিজ বাড়িতে নেওয়া হলে শেষবারের মতো একনজর দেখতে ভিড় করেন স্বজন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়রা।

নিহত অপ্রতিমের অকাল ও মর্মান্তিক বিদায়ে তার পরিবার ও সহপাঠীদের মাঝে নেমে এসেছে শোকের মাতম। সামাজিক মাধ্যমে এই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে সারা দেশ। একখণ্ড যন্ত্রের জন্য একটি প্রাণবন্ত শিশুর নির্মম পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না কেউই।

অপ্রতিমের মৃত্যুতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা ড. নাহিদা বেগম। যে সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় আকুতি জানিয়েছিলেন, সেই সন্তানই ফিরছে নিথর দেহ হয়ে। প্রিয় ক্যাম্পাস ও গন্ধমতির মাটিতে শেষবারের মতো বিদায় জানানো হয় অপ্রতিমকে।