আর নিতে পারছি না

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩১ এএম

আর নিতে পারছি না সত্যিই নিতে পারছি না। প্রতিদিন আমাদের কাছে কত খবর আসে। কোনো খবর প্রতিবেদকের হাত ধরে, কোনোটি স্বজনের কান্নাভেজা ফোনে, আবার কোনোটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বরাতে। একজন সম্পাদক হিসেবে, একজন সাংবাদিক হিসেবে, আমাদের দায়িত্ব সেই খবর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আমরা তথ্য যাচাই করি, ভাষা সম্পাদনা করি, শিরোনাম লিখি। তারপর ছাপার অক্ষরে কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে সেই খবর পৌঁছে যায় মানুষের ঘরে ঘরে, হাতে হাতে। কিছু খবর আছে, যেগুলো সম্পাদনা করতে গিয়ে হাত থমকে যায়। কিছু শিরোনাম আছে, লিখতে গিয়ে নিজের সন্তানের মুখ মনে পড়ে। আর কিছু খবর পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরও বুকের ভেতর থেকে যায় অসহনীয় ভার। তখন মনে হয়, আমরা কি সত্যিই সভ্য সমাজে বাস করছি? নাকি এমন এক অন্ধকারের মধ্যে ঢুকে পড়েছি, যেখান থেকে মানুষের কান্নার শব্দও আর আমাদের ঘুম ভাঙাতে পারে না?

কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতিমের লাশ উদ্ধার হয়েছে। তেরো বছরের একটি শিশু। মায়ের মুঠোফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে বের হয়েছিল। তারপর নিখোঁজ। পরের দিন তার মরদেহ পাওয়া গেল বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন জঙ্গলে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত। তদন্ত চলছে। হত্যার কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে পুলিশ কিছু তথ্য দিয়েছে। জানানো হয়েছে তার কাছে থাকা মায়ের আইফোনটি কেড়ে নেওয়ার জন্যই এই নির্মম হত্যা। গ্রেপ্তার তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। এরপরও কিছু প্রশ্ন থেকে গেছে।  তদন্তের বিস্তারিত ফলাফলের জন্য আমাদের হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু সন্তান যেখানে নেই, সেখানে একজন মায়ের কাছে, একজন বাবার কাছে, একটি পরিবারের কাছে এই অপেক্ষার আর কী অর্থ আছে?

শুধু অপ্রতিম নয়, এর আগেও এ বছর নিখোঁজ শিশুদের কাউকে পাওয়া গেছে মাটিচাপা অবস্থায়, কাউকে নদীতে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, বছরের প্রথম আট মাসে ৩৬ নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজের পর লাশ উদ্ধার ছাড়াও চলতি বছর শিশুদের ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু এবং স্বজনের সঙ্গে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য নিয়ে পরিসংখ্যান তৈরি করে আসক। তাদের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) শিশু নিখোঁজের পর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অন্যান্য ঘটনায় মোট নিহত শিশুর সংখ্যা ১৫৫। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে নিহত ৬৮, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে নিহত ৪৯, ধর্ষণের পর হত্যা (দুই ছেলেশিশুসহ) ২৬, ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা চার, গুলিতে নিহত তিন, গৃহকর্মীকে শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু দুই, উত্ত্যক্তকারীর হাতে হত্যা দুই এবং অপহরণের পর হত্যা করা হয় একজনকে। এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনা আছে।

অপ্রতিমের মা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, বাবা ব্যবসায়ী। তারা তাদের সন্তানকে পৃথিবীতে এনেছিলেন এক বুক স্বপ্ন নিয়ে। সেই স্বপ্নের বয়স ছিল মাত্র তেরো বছর। এখন তাদের ঘরে কী আছে? একটি বিছানা। কিছু বই। হয়তো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পোশাক। একটি দরজা, যে দরজা দিয়ে অপ্রতিম বেরিয়ে গিয়েছিল। যে দরজার বাইরে ঝুলছে নান্দনিক নেমপ্লেট ‘অপ্রতিমদের বাসা’। আহা অপ্রতিম একটি অসম্ভব দীর্ঘ হাহাকারের কাছে আমাদের সব শব্দ আজ পরাজিত।

খুলনায় ভাত খেয়ে ফেলার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আজমুলকে পিটিয়ে হত্যার খবরও আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একজন মানুষকে হত্যা করার জন্য কতটা অমানবিক হয়ে উঠতে হয়? ক্ষুধা, খাবার, রাগ এসব মানুষের স্বাভাবিক জীবনের অংশ। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার মধ্যেই যখন আমরা হত্যার যুক্তি খুঁজে নিই, তখন প্রশ্ন ওঠে আমাদের ভেতরের মানুষটি কোথায় গেল? একটি ভাতের থালা কি মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে গেল?

কোনো অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা, কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকুক বা না থাকুক বিচার করার অধিকার কি আমরা নিজের হাতে তুলে নিতে পারি? কাউকে পিটিয়ে হত্যার অধিকার কি কোনো ব্যক্তি, কোনো গোষ্ঠী, কোনো জনতা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে? না, কোনো সভ্য সমাজে এই অধিকার কারও নেই।

অথচ আমরা বারবার দেখছি, মানুষ নিখোঁজ হচ্ছে। শিশুরা হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবারের লোকরা থানায় ছুটছেন, হাসপাতালের মর্গে ছুটছেন, সামাজিক মাধ্যমে সন্তানের ছবি দিয়ে আকুতি জানাচ্ছেন ‘আমার সন্তানকে খুঁজে দিন।’ কেউ ফিরে আসছে সুস্থভাবে। কেউ ফিরছে লাশ হয়ে। আর আমরা? আমরা কিছুক্ষণ শোক করছি। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছি। ক্ষোভ প্রকাশ করছি। তারপর অন্য কোনো খবরের দিকে চলে যাচ্ছি।

যে পরিবারটি সন্তান বা প্রিয়জন হারিয়েছে, তাদের কাছে পৃথিবী আর আগের মতো নেই। আমাদের কাছে একটি সংবাদ হয়তো এক-দুই মিনিটের। আর ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে সেটিই হয়ে ওঠে সারা জীবনের দুঃস্বপ্ন।

এই লাশের ভার আমরা আর নিতে পারছি না। প্রশ্ন হচ্ছে যাদের দায়িত্ব, তাদের কি ঘুম ভাঙবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের কাছে চাইলে হবে না। জননিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে জবাব চাইতে হবে, প্রশাসনের কাছে জবাব চাইতে হবে। কেন একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে জীবিত উদ্ধারের নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারি না? কেন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে এত অনিশ্চয়তা? কেন একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার মতো অপরাধের ক্ষেত্রেও সমাজের কোনো কোনো অংশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে?

প্রতিটি হত্যার তদন্ত হতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। বিচার হতে হবে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে। রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব তার নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তবে দায় কেবল সরকারের নয়। দায় আমাদেরও। দায় আমাদের পরিবারগুলোর, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর। দায় আমাদের পাড়া-মহল্লার, আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর। দায় আমাদের প্রত্যেকের, যারা অন্যায় দেখেও কখনো কখনো মুখ ফিরিয়ে নিই। আমরা কি আমাদের সন্তানদের শেখাচ্ছি, মানুষের জীবন সবকিছুর ঊর্ধ্বে? শেখাচ্ছি কি, রাগের মুহূর্তে কারও গায়ে হাত তোলা কোনো বীরত্ব নয়? শেখাচ্ছি কি, ভিন্নমত মানেই শত্রুতা নয়? শেখাচ্ছি কি, কোনো গুজবের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী বানিয়ে ফেলা যায় না? শেখাচ্ছি কি, একজন দুর্বল মানুষকে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব? নাকি আমরা সন্তানদের হাতে তুলে দিচ্ছি কেবল প্রতিযোগিতা, সাফল্য আর ভোগের পাঠ? শেখাচ্ছি, জিততেই হবে, নিজের কথাই শেষ কথা, অন্যকে পরাস্ত করাই শক্তির পরিচয়? আমরা আমাদের সন্তানদের কতটুকু সময় দিচ্ছি, কতটুকু মানবিক শিক্ষা দিচ্ছি, ডিজিটাল যুগে তাকে নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছি এই সব কিছুই ভাবতে হবে বুকে হাত দিয়ে। 

আমরা ভালো করেই জানি, একটি সমাজে যখন সহমর্মিতা কমতে থাকে, তখন সহিংসতা বাড়ার জন্য খুব বেশি কিছু লাগে না। যে সমাজে অন্যের কান্না বিনোদন হয়ে ওঠে, যে সমাজে হত্যার ভিডিও মানুষ কৌতূহল নিয়ে দেখে, যে সমাজে অপরাধের চেয়ে অপরাধীর পরিচয় নিয়ে বেশি আলোচনা হয়, যে সমাজে ভুক্তভোগীর পোশাক, আচরণ কিংবা পারিবারিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়; সেই সমাজের সংকট শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, সংকট আমাদের নৈতিকতার।

আমরা ভুলে যাচ্ছি, প্রতিটি শিশুই একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ। প্রতিটি তরুণ একটি পরিবারের স্বপ্ন। প্রতিটি মানুষ একটি পৃথিবী। অপ্রতিমের পৃথিবী আর ফিরবে না। খুলনায় নিহত আজমুলের পৃথিবীও আর ফিরবে না। যেসব শিশু নিখোঁজ হয়ে গেছে, তাদের প্রত্যেকের জন্য কোনো না কোনো ঘরে আজও হয়তো দরজা খোলা রাখা হয়। কেউ হয়তো সন্তানের ফিরে আসার আশায় রাত জাগেন। কেউ হয়তো প্রতিটি অচেনা ফোনকলকে মনে করেন ‘এই বুঝি আমার সন্তান’!

আমরা কি সেই অপেক্ষার যন্ত্রণা বুঝতে পারি? যদি না পারি, তবে অন্তত বোঝার চেষ্টা করি।

আমাদের রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় হতে হবে। নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানে কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে হবে। জনতার হাতে বিচার তুলে নেওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আর আমাদের নিজেদেরও বদলাতে হবে।  কারণ আইন ভয় দেখিয়ে মানুষকে কিছু দিন থামিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে মানুষের বিবেককে জাগাতে হয়।

আজ আমরা অপ্রতিমের জন্য কাঁদছি। কাল যেন আর কোনো অপ্রতিমের জন্য কাঁদতে না হয়। আজ একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের হত্যায় ক্ষুব্ধ হচ্ছি। কাল যেন আর কোনো তরুণকে তুচ্ছ কোনো অজুহাতে প্রাণ দিতে না হয়। আজ নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছি। কাল যেন কোনো পরিবারকে সন্তানের ছবি হাতে রাস্তায় দাঁড়াতে না হয়। আমরা আর লাশ দেখতে চাই না। আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক, চাই না। আর কোনো বাবার কণ্ঠে সন্তানের নাম ধরে অসহায় আর্তনাদ শুনতে চাই না। আর কোনো শিশুর শৈশব রক্তে ভেসে যাক, চাই না।

আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে সন্তান ঘর থেকে বের হলে মা-বাবা আতঙ্কে বুক চেপে ধরে থাকবেন না। যেখানে একজন মানুষ ক্ষুধার কারণে অপমানিত হলেও হত্যার শিকার হবেন না। যেখানে অপরাধের বিচার হবে আদালতে, রাস্তায় নয়। যেখানে মানুষের জীবন কোনো পণ্য, কোনো বস্তু, কোনো তুচ্ছ বিরোধের চেয়ে ছোট হবে না। এই চাওয়া কোনো বিলাসিতা নয়। এটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার।

আমরা রাষ্ট্রের কাছে জবাব চাই। সমাজের কাছে জবাব চাই। নিজেদের কাছেও জবাব চাই। কারণ প্রতিটি লাশ আমাদের দরজায় এসে দাঁড়াচ্ছে। প্রতিটি নিখোঁজ শিশু আমাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে।

আর কত লাশ দেখলে আমাদের ঘুম ভাঙবে? আর কত মায়ের কান্না শুনলে আমরা বুঝব, এই দেশ কেবল আমাদের নয় আমাদের সন্তানদেরও? আর কত অপ্রতিম হারিয়ে গেলে আমরা সত্যিই বলব আর নিতে পারছি না।

মুস্তাফিজ শফি : সম্পাদক দেশ রূপান্তর, বহুমাত্রিক লেখক।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত