ঝুঁকিতে ৪৩ কমিউনিটি ক্লিনিক

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম ভরসা কমিউনিটি ক্লিনিক। কিন্তু এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো এখন নিজেই ‘রোগাক্রান্ত’ হয়ে পড়েছে। উপজেলার মোট ৬৯টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ৪৩টি ক্লিনিকের ভবনই দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বহু বছর কোনো মেরামত বা সংস্কারকাজ না হওয়ায় এসব ভবনের দেয়াল ও ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ছে। জরাজীর্ণ পরিবেশের মধ্যেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের অসহায় মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এই চরম অব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গর্ভবতী নারী, নবজাতক, শিশু এবং গ্রামীণ দরিদ্র রোগীরা। নিরাপদ ও নিরিবিলি পরিবেশে যেখানে মা ও শিশুর যতœ নেওয়ার কথা, সেখানে প্রতিনিয়ত ছাদ ধসে পড়ার আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে সেবাগ্রহীতাদের। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, যেকোনো মুহূর্তে এই নড়বড়ে ভবনগুলো ধসে পড়ে বড় ধরনের প্রাণহানি বা ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, ফুলবাড়ি ইউনিয়নের ৪টি, নাকাই ইউনিয়নের ৩টি, কাটাবাড়ি ইউনিয়নের ৩টি, হরিরামপুর ইউনিয়নের ২টি, তালুককানুপুর ইউনিয়নের ৫টি, মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের ৩টি, শালমারা ইউনিয়নের ৩টি, শাখাহার ইউনিয়নের ৩টি, কোচাশহর ইউনিয়নের ২টি, রাখালবুরুজ ইউনিয়নের ২টি, রাজাহার ইউনিয়নের ১টি ও গুমানীগঞ্জ ইউনিয়নের ৩টিসহ মোট ৪৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবনের অবস্থা একেবারেই বেহাল। এরমধ্যে বেশিরভাগ ভবন প্রায় ২৬ বছর আগে নির্মাণ করা হয়। সেই থেকেই সংস্কার না হওয়ায় অধিকাংশ ভবনের  দেয়াল ও ছাদে ফাটল ধরেছে। পলেস্তারা খসে পড়েছে। দরজা-জানালা ভেঙে গেছে। কোথাও মেঝে দেবে গেছে। বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়।

অধিকাংশ ক্লিনিকে টয়লেট ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থাও নেই। রোগীদের বসার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। বেশ কিছু ক্লিনিক ভবনের ছাদের কার্নিশসহ বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী ও সেবাগ্রহীতারা নিয়মিত আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। ঝুঁকির কারণে অনেক গর্ভবতী নারী এসব ক্লিনিকে যেতে সাহস পান না। উপজেলার গ্রামীণ জনপদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা হচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো। কিন্তু ভবনের বেহাল অবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে চলছে ওষুধের সংকট।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলার ৬৯টি ক্লিনিকের অধিকাংশেই প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুদ থাকে না। ফলে প্রত্যন্ত এলাকার মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, প্রজননস্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং সাধারণ রোগের চিকিৎসাসহ নানা জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

নাকাই ইউনিয়ন পরিষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ওয়াহেদুন্নবী সরকার জানান, নিয়মানুসারে প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে গ্রামীণ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য অন্তত ২০ ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্লিনিকেই দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় ওষুধ মিলছে না। মাঝেমধ্যে সামান্য ওষুধ সরবরাহ করা হলেও তা দিয়ে চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। এতে করে দূরদূরান্ত থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা নিতে আসা প্রান্তিক মানুষকে অনেক সময় খালি হাতেই ফিরতে হয়।

উপজেলার নাকাই ইউনিয়নের খুকশিয়া কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) মাহমুদ আরাফাত মিশন বলেন, ক্লিনিক ভবনের একটি অংশ ধসে পড়েছে। রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়। বিগত ২৫ বছর আগে ক্লিনিকটি নির্মাণের পর থেকে আজ পর্যন্ত মেরামত না করায় ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কুঞ্জমালঞ্চা কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি শরিফুল ইসলাম বলেন, ক্লিনিকের ভবনের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, সেখানে চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অবস্থা দেখে মনে হয় এগুলো নিজেরাই লাইফ সাপোর্টে আছে। জরাজীর্ণ ক্লিনিকগুলো ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, যেসব কমিউনিটি ক্লিনিক ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো তালিকা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। ওষুধ সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, এ নিয়ে নানা সমস্যা হচ্ছে।