ইসলামী ব্যাংকের পিএলসির প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনের পদত্যাগ দাবি করেছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। তিন মাসের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেও ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন, চলমান মামলাগুলোকে গতিশীল করা এবং প্রশাসকের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়গুলোতে কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় তারা এ দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর পরিচালনা পর্ষদ গঠনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ চেয়েছে সংগঠনটি।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে দাবি জানান ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুর নবী মানিক। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও সাধারণ আমানতকারীরা।
নুর নবী মানিক বলেন, যে মামলা চলছিল, সেই গুলোকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে আসা এবং মামলাগুলোকে গতিশীল করার দায়িত্ব ছিল। কিন্তু তিন মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। একটি সমস্যাও সমাধান করতে পারেননি।
তিনি বলেন, প্রশাসকের এখতিয়ারের মধ্যে থাকা অনেক বিষয় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার প্রয়োজন ছাড়াই সমাধান করার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেসব বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের দোহাই দিয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়ে দেওয়ার মধ্যেই তার কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তিনি আবও বলেন, যিনি তার এখতিয়ারের মধ্যে থাকা বিষয়গুলো সমাধান করছেন না এবং ইসলামী ব্যাংককে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন করছেন না, গ্রাহকদের পক্ষ থেকে আমরা তাকে অনুরোধ করব, আপনার যে কর্মস্থল, সেই কর্মস্থলে আপনি ফিরে যান। আপনার ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে আপনি কর্মস্থলে ফিরে যান।
এর আগে গত ১৪ জুন ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যের নিয়োগ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পর্ষদের সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন জোরদার এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
তবে তিন মাসের বেশি সময়েও পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছে গ্রাহক ফোরাম। তাদের দাবি, সৎ, যোগ্য, অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে ইসলামী ব্যাংকের জন্য কার্যকর পরিচালনা পরিষদ গঠনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি ব্যাংকের মালিকানা, ঋণ অনিয়ম, লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার, চলমান মামলা এবং ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়েও বিভিন্ন দাবি তুলে ধরে ফোরামটি।
ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহক ও চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি নিয়েও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হন। ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলছে এবং একটি পক্ষ নিজেদের লোকজনকে ব্যবহার করে ব্যাংকে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া বিষয়গুলোকে নতুন করে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সামনে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিরা বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্থসহায়তা পেয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে তথ্য পাওয়ার দাবি করেন ফোরামের নেতারা। তবে এ দাবির পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা নথি প্রকাশ করা হয়নি।
গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; এর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের আমানত ও আর্থিক নিরাপত্তা জড়িত। তাই ব্যাংকের পরিচালনায় দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা না রেখে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে।
এদিকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মোহাম্মদ জহির হোসেন বলেছিলেন, ব্যাংকের জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে এবং গ্রাহকদের ব্যাংকিং সেবা নিরবচ্ছিন্ন থাকবে।