যিনি দুইবার এমএলএ, তাঁর উত্তরাধিকারীরা এখন দিনমজুর

দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে জীবন কাটানো চা বাগানের শ্রমিক সর্দার জীবন সাঁওতাল নিজ যোগ্যতায় সরাসরি ভোটে দুইবার দেশের এমএলএ বা আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন। চা শ্রমিকদের ইতিহাসে এটি এখনো অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে দেশের অন্যতম বৃহৎ ট্রেড ইউনিয়ন শ্রীহট্ট চা শ্রমিক সংঘের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সহসভাপতি ছিলেন তিনি।

বর্তমান মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৫ নম্বর কালাপুর ইউনিয়নের মাজদিহি চা বাগানে শ্রমিক সর্দার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন জীবন সাঁওতাল। ১৯৪৬ সালে আসাম প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমা থেকে ভারতীয় কংগ্রেসের মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রথমবার এমএলএ নির্বাচিত হন তিনি।

ভারত ভাগের পর ১৯৫৪ সালের তৎকালীন পূর্ববঙ্গ আইনসভা নির্বাচনে এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে পুনরায় বিপুল ভোটে এমএলএ নির্বাচিত হন জীবন সাঁওতাল।

এমএলএ নির্বাচিত হওয়ার পর চা বাগানের শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রজন্মগত দাসত্বের অবসানে অ্যাসেম্বলিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। চা শ্রমিক, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়েও কাজ করেন জীবন সাঁওতাল।

ব্রিটিশ শাসনামলে চা চাষের জন্য ভারতের বিহার, ছোট নাগপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজারো শ্রমিককে এ দেশে নিয়ে আসা হয়। কঠোর পরিশ্রম করে জঙ্গল পরিষ্কার করা ও পাহাড়ি এলাকায় চা চাষ শুরু করা এসব শ্রমিকের মধ্যে জীবন সাঁওতালের পূর্বপুরুষরাও ছিলেন। তারা ডানকান ব্রাদার্সের মালিকানাধীন মাজদিহি চা বাগানে কাজ শুরু করেন।

২০ শতকের প্রথমার্ধে ওই চা বাগানেই জন্ম হয় জীবন সাঁওতালের। তাঁর সঠিক জন্মসাল বা তারিখ জানা যায় না। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় জীবন সাঁওতাল ছোটবেলা থেকেই নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলির পরিচয় দেন। চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বেড়ে ওঠা জীবন যুবক বয়সে মাজদিহি চা বাগানের শ্রমিক সর্দার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

সততা, বুদ্ধিমত্তা, সাহস ও নৈতিকতার কারণে অল্প সময়েই তিনি শুধু মাজদিহি নয়, আশপাশের চা বাগানের শ্রমিকদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। শ্রমিকদের বিপদে-আপদে ছুটে যেতেন তিনি। অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থার সময় মাইলের পর মাইল মেঠোপথ হেঁটেও শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে কাজ করেছেন।

ন্যায্য দাবি আদায়ে শ্রমিকদের পক্ষ নিয়ে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ায় বাগান কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়েন জীবন সাঁওতাল। একপর্যায়ে কোনো কারণ ছাড়াই তাঁকে শ্রমিক সর্দারের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

চাকরি হারানোর পর শ্রীমঙ্গল শহরের পাশের পূর্বাশা আবাসিক এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন তিনি। তাঁর দুই ছোট ভাই মতিলাল সাঁওতাল ও দুর্গা সাঁওতালও শ্রীমঙ্গলের রাধানগর এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

চা বাগানের চাকরি হারানোর পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন জীবন সাঁওতাল। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি জননেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৪৬ সালের আসাম প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ভারতীয় কংগ্রেসের মনোনয়নে দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এমএলএ নির্বাচিত হন তিনি। নির্বাচিত হওয়ার পর চা শ্রমিকদের অধিকারসহ সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করেন।

এরপর ১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে আবারও এমএলএ নির্বাচিত হন জীবন সাঁওতাল। নির্বাচনের পর চা শ্রমিক, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় অ্যাসেম্বলিতে ভূমিকা রাখেন তিনি।

চা বাগানে চাকরি করার সময় থেকেই শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সক্রিয় ছিলেন জীবন সাঁওতাল। ১৯৪৬ সালে এমএলএ নির্বাচিত হওয়ার পর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা ও তৎকালীন ভারতীয় কংগ্রেস নেতা পূর্ণেন্দু কিশোর সেনগুপ্ত এবং নিকুঞ্জ বিহারী চৌধুরীর সঙ্গে চা শ্রমিকদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন তিনি।

মানবিক কর্মঘণ্টা, উন্নত আবাসন, শ্রমিক সন্তানদের শিক্ষার অধিকার এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার লক্ষ্য নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের ৩ জুন হাজারো শ্রমিকের উপস্থিতিতে কুলাউড়ায় সমাবেশের মাধ্যমে গঠিত হয় শ্রীহট্ট চা শ্রমিক সংঘ। সংগঠনটির বর্তমান নাম বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন।

প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটিতে পূর্ণেন্দু কিশোর সেনগুপ্ত সভাপতি, জীবন সাঁওতাল সহসভাপতি, নিকুঞ্জ বিহারী চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক এবং দুর্গেশ দেব সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৬০ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান সব ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে জীবন সাঁওতাল জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এরপর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজ বাসায় অনেকটা নির্বাসিত জীবন কাটান তিনি।

তাঁর রেখে যাওয়া সংগঠন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের বর্তমান সদস্য সংখ্যা সাত লাখের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চা শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এই নেতার ছবি, লিখিত জীবনী কিংবা অন্যান্য কর্মকাণ্ডের দলিল-দস্তাবেজ সংরক্ষিত নেই। এমনকি জীবন সাঁওতাল ঠিক কবে মারা গেছেন, সেই সাল ও তারিখও জানা নেই।

চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর জীবন সাঁওতাল শ্রীমঙ্গলের পূর্বাশা এলাকায় বেশ কিছু ভূসম্পত্তি কিনেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর একমাত্র সন্তান কৃষ্ণ সাঁওতাল এসব সম্পত্তি ভোগদখল করেন। তবে কাজ করে পরিবার চালাতে গিয়ে ধীরে ধীরে অনেক সম্পত্তি বিক্রি করতে হয় তাঁকে।

২০০৭ সালে কৃষ্ণ সাঁওতাল মারা যান। তখন তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তির মধ্যে পূর্বাশা আবাসিক এলাকায় মাত্র পাঁচ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত পুরোনো বাড়িটি অবশিষ্ট ছিল।

বর্তমানে ওই বাড়িতে বসবাস করছেন জীবন সাঁওতালের নাতি চন্দন সাঁওতাল ও বুলু সাঁওতাল। তাঁরা ফার্নিচারের দোকানে আসবাবপত্র রঙ করার কাজ করে সামান্য আয় দিয়ে পরিবার চালাচ্ছেন। জীবন সাঁওতালের নাতনি দীপালী সাঁওতালের বিয়ে হয়েছে জুড়ী উপজেলার সোনারূপা চা বাগানে। সেখানে তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।

জীবন সাঁওতালের নাতি চন্দন সাঁওতাল বলেন, তাঁরা শ্রমজীবী মানুষ। তিনি ও তাঁর ভাই বুলু সাঁওতাল কষ্ট করে পরিবারের ভরণপোষণ ও সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। দিন এনে দিন খেয়ে চললেও তাঁরা গর্বিত যে, তাঁরা চা শ্রমিকদের মহান নেতা ও পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের সাবেক এমএলএ জীবন সাঁওতালের নাতি।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি ও সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী পংকজ কন্দ বলেন, জীবন সাঁওতাল ছিলেন চা শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম এবং দুইবার নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। তাঁর ভাষ্য, জীবন সাঁওতাল তাঁদের গর্বের ধন। তবে ইউনিয়নের সংরক্ষণে তাঁর কোনো ছবি বা জীবনী নেই। দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেও তাঁর ছবি ও জীবনী সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।