মানুষ এখনো কত অসহায়

অষ্টাদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ও শক্তিমান কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর-এর  ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের ঈশ্বরী পাটনী চরিত্রের একটি আকুতি বা প্রার্থনা ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’। এর প্রেক্ষাপট বিস্তৃত। দেবী অন্নপূর্ণা গৃহত্যাগ করে তার পরম ভক্ত হরিহোড়ের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু হরিহোড়ের ঘরে প্রতিদিন চরম অশান্তি ও কলহ লেগে থাকত। এই পারিবারিক কলহে বিরক্ত হয়ে দেবী হরিহোড়ের বাড়ি ত্যাগ করেন এবং অপর এক ভক্ত ভবানন্দ মজুমদারের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ভবানন্দের বাড়ি যাওয়ার পথে দেবীকে গাঙ্গিনী নদী পার হতে হতো। সেই ঘাটের খেয়া পারাপারের দায়িত্বে ছিলেন দরিদ্র কিন্তু অত্যন্ত সরল ও ভক্তিপরায়ণ মাঝি ঈশ্বরী পাটনী। পাটনী তাকে নৌকায় তুলে নেয়। নৌকায় দেবী যেখানে পা রাখেন, কাঠের সেই সেঁউতি (নৌকার জল সেঁচার পাত্র) মুহূর্তেই সোনায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। এই অলৌকিক কাণ্ড দেখে ঈশ্বরী পাটনী বুঝতে পারেন, এই নারী কোনো সাধারণ মানুষ নন, স্বয়ং কোনো দেবী। তখন ঈশ্বরী পাটনী দেবীর পায়ে লুটিয়ে পড়েন। দেবী তার আসল রূপ প্রকাশ করেন এবং পাটনীর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে যেকোনো বর চাইতে বলেন। তিনি দুহাত জোড় করে দেবীর কাছে কেবল একটি চিরন্তন মানবিক আকুতি জানিয়েছিলেন- ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’।

ওপার বাংলার শক্তিমান কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় তার ‘দাঁড়াও’ কবিতায় বলেছেন, ‘মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষের পাশে দাঁড়াও।/মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও,/মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।/তোমাকে সেই সকাল থেকে তোমার মতো মনে পড়ছে,/সন্ধে হলে মনে পড়ছে, রাতের বেলা মনে পড়ছে।/মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও,/এসে দাঁড়াও, ভেসে দাঁড়াও এবং ভালোবেসে দাঁড়াও,/মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও’। নিরাপত্তাহীনতার প্রলম্বিত ছায়ার প্রেক্ষাপটে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কবিতার পঙ্ক্তিগুলো মনে অবিরত প্রশ্নের পর প্রশ্ন কাতারবদ্ধ করছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘দাঁড়াও’ কবিতাটি সমাজের অবক্ষয়, হিংস্রতা, চরম স্বার্থপরতা ও  নিঃসঙ্গতার প্রেক্ষাপটেই হয়তো লিখেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে,আজকের বাস্তবতা কি!

জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-শিক্ষাসহ সমাজের নানামাত্রিক উৎকর্ষের যে বড়াই আমরা অহরহ করি এই প্রেক্ষাপটেও তো প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে এ কোন সমাজ? এ কোন উন্মত্ততার তলোয়ারে মানুষ বলি হচ্ছে? এ কোন আগুনে মানুষ পুড়ছে? রাষ্ট্রশক্তির এর বিপরীতে অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির সমান্তরালে সংঘঠিত অপরাধের কতটা প্রতিবিধান করতে পারছে? কেন কুমিল্লার শিশু অপ্রতিম আর খুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুলরা প্রাণ হারাচ্ছে পৈশাচিকতার ছোবলে? একেকটি ঘটনা ঘটছে, বাবা-মার কাঁধ সন্তানের লাশের দুর্বহ বোঝায় পরিণত হচ্ছে! ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর-এর  ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের দুধেভাতে তো দূরের কথা, কত সন্তানের নিথর দেহ মিলছে বনে-খালে-নদীতে এর ইয়ত্তা কতটা রাখেন আমাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রকরা? অপরাধীর তালিকায় কিশোরের সংযুক্তি বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। ‘বড় ভাই’দের কদর্য হাত কত কিশোরের মাথা স্পর্শে-আশীর্বাদে জীবন বিপথে পা বাড়াচ্ছে, কেন বাড়াচ্ছে; এসব প্রশ্নের উৎসে নজর দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দায়দায়িত্ব যাদের তারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ার পরও আত্মতুষ্টির ঢেঁকুর তুলে, সেই গৎবাঁধাভাবেই বলে যাবেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে, মানুষ এখন অনেকটা স্বস্তিতে?

না, মানুষ স্বস্তিতে নেই, মানুষ কাঁদছে, মানুষ বড় অসহায়, মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ভিড়েও দুর্বৃত্তরা ছোবল মারছে। প্রশাসন আর জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যাদের দায় সর্বাধিক, যাদের পেছনে জনগণের বিনিয়োগ রয়েছে; তারা কতটা জবাবদিহির বিষয়টি আমলে রেখেছেন? ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতিত  রাজনৈতিক সরকারের প্রেক্ষাপটে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে সরকার ও প্রশাসনের অনেকের মৌনতায়, প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সহায়তায় ‘মব’ সৃষ্টিকারীদের ছত্রছায়ায় প্রজন্মের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ অর্থ কামাইয়ের ফাঁদের বিস্তৃতি ঘটানোর বিভিন্ন পথের মুখ খুলে দেয়। এই জনঅভিযোগ নানা মহল থেকে বারবার উঠলেও তা আমলে তো নেওয়া হয়ইনি, উপরন্তু আস্কারা দেওয়ার অভিযোগ আরও বড় পরিসরে উঠলেও দায়িত্বশীল অনেকেই উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজেছিলেন। বিএনপির তরফেও তখন ধারাবাহিক দুর্বৃত্তপনার প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল এবং বিএনপির অনেক নেতাই তখন বলেছিলেন, ‘মব’-এর প্রতিবিধান চাই। প্রতিবিধান তখন হয়নি এবং এখন পর্যন্তও  উদাহরণযোগ্য এ ব্যাপারে তেমন কিছু দৃশ্যমান হয়নি।

অপরাধী যদি নিষ্কৃতি পাওয়ার পথের সন্ধান পায় তাহলে সমাজের জন্য তা কতটা অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায় এর বহু নজির রয়েছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে। তারও আগে ২০০২ সালের ৯ মে ঢাকার রামপুরায় বাবার কোলে ২০ মাসের শিশু নওশিন ছিনতাইকারীদের গুলিতে প্রাণ হারালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী নওশিনের ভিটেতে হাজির হয়ে সর্বহারা মা-বাবাকে সান্ত¡না দিয়েছিলেন, ‘আল্লার মাল আল্লা নিয়ে গেছেন’! কী বিস্ময়কর অমিয় বাণী শুনি আমাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রকদের মুখে! বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ক্ষমতা গ্রহণের পরই বলেছিলেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাই অগ্রগণ্য কাজ। সাধুবাদযোগ্য অঙ্গীকার। কিন্তু প্রায় নিত্য সংবাদমাধ্যমে জননিরাপত্তাহীনতার যে চিত্র উঠে আসছে তাতে প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতার চিত্র কি ক্রমেই পুষ্ট হচ্ছে না? রাষ্ট্র কি কোনোভাবেই দুর্বৃত্তদের সৃষ্ট মর্মস্পর্শী ক্ষতের দায় এড়াতে পারে? জনগণের নিরাপত্তা বিধান করতে না পারার দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিতে হবে, ইতিমধ্যে অনেক রাজনৈতিক নেতা এই মন্তব্য করেছেন।

একেকটি ঘটনা ঘটে আর সংবাদমাধ্যমে-জনপরিসরে দাবি ওঠে, এমনটির যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। কিন্তু একটি বেদনার ছায়া সরতে না সরতেই আরও গাঢ় ছায়া জেঁকে বসছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর বিশেষ করে পুলিশের দায় সর্বাধিক। কিন্তু গত এক মাসে পুলিশের নিজেদের যে বহুমাত্রিক চিত্র উঠে এসেছে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে এ নিয়ে ভিন্ন লেখার অভিপ্রায় থাকলেও, এ প্রসঙ্গে আজকের প্রেক্ষাপটে শুধু একটি প্রশ্ন রাখতে চাই স্বাধীন বাংলাদেশে পুলিশ কতটা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পেরেছে কিংবা পারছে? এর পাশাপাশি তাদের অনেকেরই দুষ্কর্মের খতিয়ানও তো কম দীর্ঘ নয়। তবে এ সত্যও অনস্বীকার্য, পুলিশ বাহিনীতে নীতিনিষ্ট-কর্মনিষ্ট-দক্ষ ও পেশার প্রতি দায়বদ্ধ কর্মকর্তা এবং সদস্যও আছেন অনেক। কিন্তু রাজনৈতিক বলয়ে যদি পুলিশের কর্ম খতিয়ান মূল্যায়িত হয় তাহলে তারা জনকল্যাণে কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন? পুলিশের দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি নিশ্চিতের পথে ‘যদি’, ‘কিন্তু’র চিহ্ন থেকে থাকে তাহলে এর বিরূপ প্রভাব দৃশ্যমান হতে বাধ্য এবং তা ইতিপূর্বে বহুবার হয়েছেও।

তারপরও মানুষ এত কিছু শুনতে চাইবে কেন? আগে জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তা যেকোনো মূল্যে, যেকোনো কৌশলে। অস্ট্রিয়ান-আমেরিকান  রাজনীতিবিদ আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার যথাথই বলেছেন,‘যেকোনো সরকারের প্রথম কর্তব্য এবং সর্বোচ্চ দায়িত্ব হলো জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা’। এ কথা অমূলক নয়, প্রতিকারের এক ফোঁটা ওষুধের চেয়ে এক ফোঁটা প্রতিরোধ অনেক বেশি মূল্যবান। আমরা চাই, আইনি পন্থায়-ব্যবস্থায় মানুষের কল্যাণে প্রতিরোধের-প্রতিবিধানের নজির সরকার পুষ্ট করুক। মানুষ অনেক কথা শুনেছে, শুনছে, কিন্তু এসব কথা মানুষের অসহায়ত্ব কাটাতে পারছে না, তা দৃশ্যমান সত্য। সন্তান দুধেভাতে থাকার প্রেক্ষাপট তৈরি করুক রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর অবকাশ নেই। আইনের হাতের চেয়ে যদি অন্য কিছু লম্বা হয়ে পড়ে তাহলে সুশাসন কিংবা আইনের শাসনের আশা তো দূরাশায়ই রূপান্তরিত হবে। রাষ্ট্রশক্তি তো বটেই, ক্ষমতাধর ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনীতিকদের কাছে সবিনয়ে আবেদন রাখি, রাজনীতি নিয়ে বাহাস করার অনেক সময় পাবেন। এখন এই আতঙ্কতাড়িত ও দুর্বৃত্তপীড়িত মানুষের জন্য কিছু করুন।

দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনের শাসনের বদলে একধরনের জবরদস্তিমূলক পরিস্থিতি এবং আইনহীনতার চিত্র এখনো দেখা যাচ্ছে, যা জননিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে এই অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে না দিয়ে নজর দিন উৎসে। সমাজ বিরোধীদের ভূমি  কীভাবে, কী কারণে উর্বর হয়, তাও আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা রক্ষার চেয়ে বড় কোনো কিছুই নেই। নিরাপত্তা হলো জীবনরেখা, একে গুরুত্বহীনতার ছায়ায় রাখবেন না। সরকারের সাফল্য-অসাফল্যের অনেক কিছুর সমীকরণ হয় এই নিরিখেই। যে সমাজে শিশু পর্যন্ত নিরাপদ নয়, সেই সমাজ নিজেকে সভ্য দাবি করতে পারে না। যে সমাজে বিশ্ববিদালয়ের একজন শিক্ষার্থীকে কথিত ‘ভাত চুরি’র অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং মানুষের জিজ্ঞাসা আইনি বা বেআইনি পথে থামিয়ে দেওয়া হয়, সেই সমাজও নিজেকে ভদ্রসমাজ বলে চিন্তা করতে পারে না। গণতান্ত্রিক তো নয়ই। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর সমান্তরালে চাই সর্বজনের নিরাপত্তাও। দুর্বৃত্তদের চারণভূমি হতে পারে না মনুষ্য সমাজ। গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত আইনের শাসন। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অসহায়ত্ব দেখতে চাই না। সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আইন রক্ষার নসিয়ত করা হয়। কিন্তু আমরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এও দেখেছি, আইন রক্ষা করতে গিয়ে কতজনকে কতভাবে নির্মম শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। মানুষ তো সভ্য সমাজে অসহায় থাকতে পারে না।  

লেখক : সাংবাদিক, কবি ও বিশ্লেষক।

deba_bishnu@yahoo.com