হ্যারি পটারের শহর পোর্তো

পর্তুগালের পোর্তো শহরে আসার আগে মাত্র দুটো তথ্য আমার জানা ছিল এক. বিশ্বখ্যাত পানীয় পোর্ট ওয়াইনের জন্ম এখানে আর দুই. বিশ্বখ্যাত হ্যারি পটার বইটির (অন্তত প্রথম ৩ অধ্যায়ের) জন্ম এখানে।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে (১৯৯১) জে. কে. রাউলিং পোর্তো শহরে ইংরেজি পড়াতে এসেছিলেন। এই শহরেই দাম্পত্য জীবন শুরু করেন। জন্ম নেন কন্যা জেসিকা। রাউলিংয়ের এই ক্ষণিকের দাম্পত্য জীবন টেকেনি। ছোট্ট জেসিকাকে কোলে আর হ্যারি পটারের তিনটি অধ্যায় বোঝা-সহ সুটকেসে নিয়ে তিনি পর্তুগাল ছাড়েন ১৯৯৩ সালে। যেহেতু তিনি এই শহরে দু’বছর থাকাকালে বইটির শুরুর অংশ লেখেন, ফলে হ্যারি পটার আর পোর্তোকে ঘিরে নানা গল্পের জন্ম আমি অস্বাভাবিক মনে করি না।

দুটি গল্প তার মধ্যে বহুল প্রচলিত এক নম্বর, জে. কে রাউলিং ‘লিভরারিয়া লেলো’ বইয়ের দোকান দেখে বিমোহিত হয়ে সেই আদলে হ্যারি পটার সিনেমায় ‘ফ্লরিশ অ্যান্ড ব্লটস’ বুকশপ নির্মাণ করেছেন। আর দুই নম্বর, মেজেসটিক ক্যাফের মার্বেল টেবিলে বসে তিনি দিনভর কফি পান করতে করতে হ্যারি পটার লিখেছেন। এইসব ভাবতে ভাবতে শহর পরিদর্শন শুরু করে দিই।

 হেঁটে হেঁটে শহর ঘোরা আমার বেশ পছন্দের। পোর্তোর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না।  কিন্তু হ্যারি পটার-প্রিয় মানুষের কাছে পোর্তো ‘সত্যি সত্যি রূপকথার’ শহর বলে মনে হবে। হবেই-বা না কেন? পোর্তো শহরের কোনো প্রভাবই যে হ্যারি পটারে নেই, তা তো নয়! শহরটির বিশাল দর্শনীয় কারুকার্যখচিত চার্চ, দালানকোঠা, অলিগলি রাস্তা সবকিছুই আপনাকে সেই জাদুময়তায় ডুবিয়ে দেবে। এমনকি পোর্তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন তাদের ঐতিহ্যবাহী ইউনিফর্ম ক্লকস পরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে, তখন হ্যারি পটারের হগওয়ার্টসের কথা আপনার মনে পড়বেই।

 দৌরো নদীর পাড় ধরে হাঁটতে থাকি। এই ছোট্ট আঁকাবাঁকা নদীটাই পোর্তোর প্রাণ। আটলান্টিক থেকে ফিরে আসা জেলে নৌকাগুলোকে দেখতে পাই। ভাবতে থাকি, জাহাজে করেই তো ভাস্কো দ্য গামা ভারত পর্যন্ত চলে এসেছেন। দৌরো নদীতে এখনো জেলে নৌকার দেখা মেলে, কিন্তু পর্যটকদের জন্য ছোট-মাঝারি প্রমোদতরীর সংখ্যাই বেশি। তাতো হবেই পোর্তো শহরে শুধু ইউরোপ নয়, সারা পৃথিবী থেকে পর্যটক আসে।

নদীর ওপর সেই বিখ্যাত লোহার ব্রিজটাকে দেখতে পাই ডম লুইস প্রথম সেতু। পোর্তোর আইকন বলা যেতে পারে।  শুনেছি, পোর্তো শহরের ম্যাকডোনাল্ডস পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ম্যাকডোনাল্ডসগুলোর একটি। ভাবলাম, ঢোকা যাক। বার্গার খেলাম, সঙ্গে কোমল পানীয়। ছবিও তোলা হলো।

তারপর আবার হাঁটতে শুরু করলাম। এবার গন্তব্য লেলো বুকশপ। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় দৌরো ভ্যালি ভ্রমণ আর রিভার ক্রুজের নানা চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল। একবার সময় করে দৌরো ভ্যালি দেখতে যেতে হবে। দৌরো ভ্যালি হচ্ছে আঙুরের স্বর্গরাজ্য।

এই দৌরো অঞ্চলেই জন্ম নেয় বিখ্যাত পোর্ট ওয়াইন। এখানকার আঙুর দিয়ে তৈরি হয় সেই ওয়াইন। ঐতিহাসিকভাবে সেই ওয়াইন নদীপথে নিয়ে আসা হতো পোর্তোর ঠিক উল্টো দিকে, ভিলা নোভা দ্য গাইয়ার ওয়াইন সেলারগুলোতে। কত কত কিছুর জন্য যে পোর্তো শহর বিখ্যাত, সে কথা বলে শেষ করা কঠিন।

হাঁটতে হাঁটতে লাঞ্চের সময় হয়ে গেল। ভাবলাম, ম্যাজেসটিক ক্যাফেতেই যাই, যার সঙ্গে জে. কে. রাউলিংয়ের নাম জড়িয়ে নানা গল্প চাউর হয়ে আছে। কিন্তু বিধিবাম! ভেতরে একটি চেয়ারও খালি নেই। পর্যটকরা ঠা ঠা রোদে লম্বা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি লাইনে দাঁড়ালাম না। স্রেফ উঁকি দিয়ে নয়ন জুড়িয়ে চলে এলাম। আমার সময়ও ফুরিয়ে এসেছে। আমার ধারণা, এই ক্যাফের স্থাপত্য শৈলীই এর গুজবের আসল কারণ। মনে মনে ভেবে নিতে কোথাও আটকায় না, একদম মিলে যায়।

তারপর চললাম লেলো বুকশপে নাম লিভরারিয়া লেলো। ‘লেলো’ নামটা শুনতেই হিন্দি শব্দের বাংলা মানে মাথায় ঝিলিক দিয়ে গেল! কিন্তু একটা বুকশপে ঢোকার জন্য এত ভিড় হতে পারে, আগে কোনোদিন দেখিনি, শুনিওনি। বই নেওয়া তো দূরের কথা! শুধু তাই নয়, এই বুকশপে ঢোকার জন্য সময়ভিত্তিক প্রবেশ টিকিট চালু করা হয়েছে। আমি বাংলা টাকায় প্রায় দেড় হাজার টাকা দিয়ে একটি টিকিট কাটলাম। দুপুর একটার সময় ঢুকতে দেবে। অস্বীকার করার উপায় নেই লেলো আসলেই খুব সুন্দর, নান্দনিক আর বইয়ের সম্ভারে সমৃদ্ধ একটি বইয়ের দোকান। বিশাল কাঠের বুকশেলফ। মাথার ওপর রঙিন কাচ। মাঝখান দিয়ে উঠে গেছে সেই বিখ্যাত লাল সিঁড়ি। এই সিঁড়িটাই হ্যারি পটার নিয়ে গুঞ্জন তৈরির আসল কারণ। আর গুজব হবেই-বা না কেন লাল রঙের সিঁড়িটাকে দেখা মাত্র এক ঝটকায় আপনি হ্যারি পটারের সময়ে চলে যাবেন। অদ্ভুত ব্যাপার! বইয়ের দোকানটা শুধু বইয়ে নয়, মানুষেও ঠাসা। প্রতিদিন অন্তত ৩ থেকে ৫ হাজার উৎসাহী পর্যটক লেলো বুকশপ দর্শনে আসেন। ঘণ্টাখানেক পরে বেরিয়ে এলাম।

 বেলা গড়িয়ে চলল। দিন প্রায় শেষান্তে। চলে এলাম পোর্তো শহরের ব্যস্ত চত্বরে। সবাই হ্যাংআউট করে। বসে থাকে। কফি খায়। চারপাশে কী ঘটছে দেখে। কেউ গিটার বাজিয়ে গান গায়। কেউ কেউ দলবেঁধে নাচছে আয় তবে সহচরী, হাতে হাত ধরি ধরি। চারপাশে স্যুভেনির শপ। লোকে লোকারণ্য অবস্থা। দেখতে দেখতে সূর্য ডোবার পালা এসে গেল। জানি না একটু পরেই চাঁদ উঠবে কি না। আমার ওঠার পালা এখন।

ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঠিক সময়ে বাস ছেড়ে দিল। এই এক দারুণ রীতি। দেখে বিগড়ে যাওয়া ঘড়ির সময় মেলাতে পারবেন। এক মিনিটও দেরি হবে না! বাস ছুটল লিসবনের দিকে। পেছনে পড়ে রইল আমার প্রিয় রূপকথার শহর পোর্তো। মনের মধ্যে বাসনা জাগিয়ে রাখলাম এর পরের বার এলে পোর্তোর ধারেকাছে কোনো এক গ্রামে গিয়ে কিছুদিন অলস সময় কাটিয়ে যাব।