মামলা পরিচালন ব্যয় কমেছে ১৩ কোটি টাকা

দুই বছর বা তার কম সাজা হয়, এমন অপরাধে জড়িতদের গ্রেপ্তারের পর স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সংক্ষিপ্ত আদালতে (সামারি কোর্ট) বিচার করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এতে পুলিশের সময়, শ্রম ও অর্থ তিনটিই সাশ্রয় হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছোটখাটো ঘটনায় থানায় মামলা রেকর্ড হলে, পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার তদন্ত থেকে শুরু করে বিচারপ্রক্রিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অথচ সামারি কোর্টে এগুলোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমাধান সম্ভব হচ্ছে। অবশ্য এতে রাষ্ট্রকে আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো গেলেও নিরপরাধ মানুষ বিপদে পড়ার শঙ্কা থেকেই যায়।

গত বছর মার্চে সামারি কোর্টে বিচার পদ্ধতি চালু করে ডিএমপি। ডিএমপির মতিঝিল, তেজগাঁও, ওয়ারী, গুলশান, মিরপুর, রমনা, লালবাগ ও উত্তরা এই আটটি ক্রাইম ও ট্রাফিক বিভাগে ডিএমপি অধ্যাদেশ ১৯৭৬ এবং সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সহ অন্যান্য আইনের ধারার ছোটখাটো অপরাধের মামলার নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। এর জন্য সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে আইন ও বিচার বিভাগ থেকে আটজন স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে ডিএমপিতে পদায়ন করা হয়। সেই সঙ্গে একজন আইন কর্মকর্তাকেও (জেলা ও দায়রা জজ) পদায়ন করা হয়েছে।

চালুর পর থেকে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ডিএমপি সামারি কোর্টে ৬৬ হাজার ২৫৬টি ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে অল্প পরিমাণে মাদক রাখা, চুরি ও ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধে সাজা দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় গড়ে দুই হাজার টাকা ব্যয়বিল ধরলেও সরকারের আর্থিক ক্ষতি কমেছে ১৩ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ভুক্তভোগী ও অপরাধীদের থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের দীর্ঘদিনের চর্চা বন্ধ হওয়ায় ক্ষতি কমেছে আরও কয়েকশ কোটি টাকা। মামলার তদন্ত বিল হিসেবে একজন কর্মকর্তা নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই ও মাদক মামলাসহ অন্যান্য মামলায় ২ হাজার টাকা বরাদ্দ পান। ২০২১ সালের মামলা তদন্ত ব্যয়বিল আদেশে এ তথ্য উল্লেখ আছে।

ডিএমপি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের মার্চ থেকে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ৬৬ হাজার ২৫৬টি ফৌজদারি মামলা সামারি কোর্টে নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় আসামি ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ৩৭৫ জন। তাদের মধ্যে কারাদন্ড হয়েছে ৬৫ হাজার ১৮৬ জনের। অর্থদন্ড হয়েছে ৩ কোটি ৩৯ লাখ ২৮ হাজার ৮৪০ টাকা এবং বাজেয়াপ্ত সম্পদ ২৮ লাখ ৪৬ হাজার ২৩১ টাকার। একই সময়ে সড়ক পরিবহন আইনে মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ১৪টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৩ হাজার ৮৬০টি। এতে আসামির সংখ্যা ২৭ হাজার ৯৮৬ জন। আদায়কৃত অর্থদন্ডের পরিমাণ ৭১ লাখ ৯৬ হাজার ৫০ টাকা।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ডিএমপির ক্রাইম ইউনিটের মতিঝিল বিভাগ ৫৬৬০টি, তেজগাঁও ৪৯৪৮, ওয়ারী ৪০৫৬, গুলশান ৩৮১৮, মিরপুর ৮৩৪৪, রমনা ২৮২৯, লালবাগ ৩০১৭টি এবং উত্তরা ৪৫০৫টি মামলা সামারি কোর্টে নিষ্পত্তি করেছে। শুধু আগস্ট মাসেই সর্বোচ্চ ৬৬৩২টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ৬৭ হাজার ২০২ জন। তাদের মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে ৪০ হাজার ৭৩৯ জনের এবং অর্থদন্ডের মাধ্যমে মুক্তি পেয়েছে ২৫ হাজার ৭৯ জন। এ ছাড়া নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় ১ হাজার ৩৮৪ জন খালাস পেয়েছে। সামারি কোর্টে সাজার হার ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এই সময় অর্থদন্ডের পরিমাণ এক কোটি ৭৫ লাখ ৭৪ হাজার ৯১০ টাকা এবং বাজেয়াপ্ত সম্পদ ১৩ লাখ ২৫ হাজার ৪৫২ টাকার।

ডিএমপির একটি থানার এসআই পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, সামারি কোর্টে বিচারপ্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুবিধা হয়েছে বেশি। আগে ১০০ গ্রামের নিচে গাঁজা বা অন্য মাদকসহ কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিলে ওসির ঝাড়ি খাওয়া লাগত। তিনি বলেন, ‘আপনি একজন মাদকসেবী বা কারবারিকে দেখছেন কিন্তু তাকে ধরছেন না এটা অপরাধীকে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তারপরও আগে ওই অবস্থায় কাউকে যখন ধরা হতো, তখন তার কাছ থেকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হতো। কিন্তু এখন সেই সুযোগ নেই। কাউকে ধরলেই তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমার দেখা অনেক মাদকসেবী ভালো হয়ে গেছে। অল্প মাদকসহ গ্রেপ্তারকৃতরা সাধারণত মাদকসেবী হয়। তাদের মধ্যে অধিকাংশই সমাজের সম্ভ্রান্ত ও বিত্তবান ঘরের সন্তান। পরিবারের অজান্তে মাদক সেবন করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে, আগে টাকা দিয়ে ছাড়া পেতেন। কিন্তু এখন ধরাপড়া মানেই আপনাকে সাজাভোগ করতে হবে। সমাজ ও পরিবার জেনে যাওয়ার ভয়ে অনেকেরই মাদক ছেড়ে দেওয়ার রেকর্ড আছে। এতে সবচেয়ে বড় উপকার হয়েছে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের। এখন সাধারণত মাসে ১/২টা মাদক মামলার তদন্ত আসে। আগে যেখানে ৫/৭টি আসত। এতে পুলিশের সময় ও শ্রম বাঁচার পাশাপাশি সরকারের অর্থ খরচও কম হচ্ছে। মামলা যত সাধারণ বা গুরুত্বহীনই হোক তদন্তে নামলে পরিচালন ব্যয় লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়, যেটা সাশ্রয় হচ্ছে।’

তবে ডিএমপির আরেক কর্মকর্তা বলেন, এই বিচার পদ্ধতিতে সুবিধার পাশাপাশি কিছুটা অসুবিধাও আছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আসামি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে যদি নিজের অপরাধ স্বীকার না করে, তাহলে মামলা করতে হয়। অনেক আসামি অপরাধ স্বীকার করতে চান না। পরে কোর্ট থেকে তাকে ফেরত পাঠানো হয়। এতে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ায় আইনগত ঝামেলা সৃষ্টি হয়। সামারি কোর্টে নিরপরাধ মানুষকে অহেতুক হয়রানির সুযোগ নেই। পুলিশের কোনো সদস্য কাউকে বিনা কারণে ফাঁসাতে চাইলেও ভুক্তভোগী ব্যক্তি সামারি কোর্টে বিষয়টি অস্বীকার করলেই ন্যায়বিচার পাবেন।

মামলা তদন্ত প্রক্রিয়ায় খরচ : কোনো ব্যক্তি থানায় মামলা করার পর পুলিশকে তার অভিযোগের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। এ প্রক্রিয়ার প্রতিটা পর্যায়ে সরকারের খরচ রয়েছে। তদন্ত সূত্রে জানা যায়, প্রতারণার অভিযোগ, মাদক ও চুরি-ছিনতাইসহ অন্যান্য অভিযোগে মামলা রেকর্ড হওয়ার পর যদি ঘটনাস্থল থেকে আসামি গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়, তাহলে খরচ কমে আসে। এ ছাড়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও প্রাথমিক অভিযানে জ্বালানি ও একাধিক সদস্যের যাতায়াত ৫-১০ হাজার; তদন্ত কর্মকর্তার বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত, যোগাযোগ, নথিপত্র সংগ্রহ ৩-৭ হাজার; অপরাধী শনাক্ত, অবস্থান ও গতিবিধি সম্পর্কে জানতে সোর্স নিয়োগে ৫-১৫ হাজার; আসামি গ্রেপ্তার আদালতে প্রেরণ ও জিজ্ঞাসাবাদে ৮-২০ হাজার; সাক্ষী শনাক্ত ও জিজ্ঞাসাবাদসহ তাদের তাদের আদালতে আনা-নেওয়া ও তদন্তসংক্রান্ত আনুষঙ্গিক ব্যয় ৩-৮ হাজার; আলামত সংগ্রহ, প্যাকেটিং, সংরক্ষণ ও পরিবহনে ৩-৮ হাজার; ফরেনসিক, ডিজিটাল, ল্যাবসংক্রান্ত ৩-১০ হাজার; একাধিক জায়গায় অতিরিক্ত অভিযান ও তল্লাশি ৫-১৫ হাজার এবং তদন্ত নথিপত্র প্রস্তুত ২-৫ হাজার টাকা। এসব মিলে জটিলতার ওপর নির্ভর করে একটি মামলায় সাধারণত ৩৭ হাজার থেকে এক লাখ টাকা খরচ হয়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তিও কমবেশি হয়। অনেক সময় দেখা যায়, যেই অপরাধের শাস্তি ছয় মাস, সেই অপরাধে একজন আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুই-তিন বছর কারাভোগ করছে। মামলার তদন্তে দীর্ঘসূত্রতার কারণে সাজার চেয়ে কারাভোগ বেশি হয়ে যায়। এ জন্য ছোটখাটো অপরাধে সামারি কোর্ট খুবই ভালো উদ্যোগ। তবে অপব্যবহারের ঝুঁকি থেকেই যায়। সেখানে স্বল্প সময়ে আসামির স্বীকারোক্তির ওপরেই সাজা হয়ে যায়। এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।’

ডিএমপির আইন কর্মকর্তা (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ আতাউল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিএমপির বিভিন্ন বিভাগে নিয়োগকৃত স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে সংক্ষিপ্ত বিচার পরিচালনা করা হচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেট এবং ডিএমপি পুলিশের যৌথ উদ্যোগে ৯২টি বিশেষ অভিযান চালিয়ে মাদকসেবী, মাদক ব্যবসায়ী, ফুটপাত, রাস্তা দখলকারী, খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণকারী, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী, ওজনে কারচুপিকারী এবং মব ভায়োলেন্স সৃষ্টিকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ডিএমপির আটটি ক্রাইম ও ট্রাফিক বিভাগে মামলার নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। গত বছরের মার্চ থেকে এই কোর্ট চলছে। যেসব মামলার সাজা দুই বছরের কম, সেসব মামলা সামারি কোর্টে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। ওইসব ঘটনায় নিয়মিত মামলা থানায় রেকর্ড করা হচ্ছে না। এতে মামলার জট কমছে। পাশাপাশি সময় ও অর্থ বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে। সামারি কোর্টে সাজা হওয়ার পরও অনেকে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিচ্ছে। এটা সারা দেশের সব পুলিশ ইউনিটে চালু করা গেলে মামলার জট কমে আসবে।’