৫৩ হাজার মসজিদ-মন্দির সংস্কারে আড়াই হাজার কোটির প্রকল্প

দেশের আট বিভাগের ৬৪ জেলায় সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া হচ্ছে দুই হাজার ৫৯০ কোটি টাকার প্রকল্প। এর আওতায় কবরস্থান, শ্মশান, মসজিদ, মন্দির, চার্চ, প্যাগোডা, গুরুদুয়ারা ও ঈদগাহসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হবে। এ খাতে ৫৩ হাজার সামাজিক অবকাঠামোর জন্য দুই হাজার ৩৬২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রকল্পটির উল্লেখ না থাকলেও এটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাস্তবায়ন করবে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যার পুরোটাই সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় দেশের আট বিভাগের ৬৪ জেলার সব উপজেলা থাকবে। তবে সিটি করপোরেশন এলাকা প্রকল্পের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। প্রকল্পের উদ্দেশে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক কল্যাণ, ধর্মীয় চেতনা ও সম্প্রীতি সুসংহত করার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক কল্যাণ ও ধর্মীয় সম্প্রীতির চেতনা শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।

প্রকল্পের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকার সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী করতে সামাজিক সমাবেশ, ধর্মীয় আচার বা অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। এসব অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় চেতনা জোরদার করার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকা-ে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পটির সঙ্গে বিগত সরকারের আমলে নেওয়া ‘সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২’ প্রকল্পের মিল রয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় কবরস্থান, শ্মশান, মসজিদ, মন্দির, চার্চ, প্যাগোডা ও ঈদগাহসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়ন, সংস্কার, মেরামত এবং প্রাচীর নির্মাণের উল্লেখ্য রয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্পটি নিয়ে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। চলমান প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের জুনে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ‘সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২’ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পটি চালু করা হবে। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রকল্পটি উল্লেখ না থাকলেও প্রকল্প প্রস্তাবের ক্ষেত্রে একটি বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ কারণে প্রকল্পটির কাজ শুরুর সময় সেপ্টেম্বর ২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা সূত্রে জানা গেছে, মূল্যায়ন কমিটি প্রকল্পে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ভিত্তি স্পষ্ট না হওয়া, চলমান প্রকল্পের ধীরগতি এবং অপ্রয়োজনীয় পরামর্শক ও গাড়ির প্রস্তাবসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় সফ্টওয়্যার কেনায় ২০ লাখ টাকা, দুটি ফটোকপি মেশিন কিনতে ১৪ লাখ টাকা এবং একটি জিপ গাড়ি কিনতে ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া সভার সম্মানী ভাতা বাবদ দুই কোটি ৮০ লাখ টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে এমন ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তা পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

কমিশনের পর্যবেক্ষণে প্রচার ও বিজ্ঞাপনে ১১ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, অনুলিপিতে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা, পেট্রোল ও লুব্রিকেন্টে ২ কোটি টাকা, ভ্রমণ ব্যয়ে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা, মোটরযান মেরামতে ৭৫ লাখ টাকা, কম্পিউটার ক্রয়ে ১৯ লাখ ২০ হাজার টাকা, ফটোকপি মেশিনে ১৪ লাখ টাকা, উৎসব ভাতায় ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং প্রশিক্ষণে ১ কোটি ১০ লাখ টাকাসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া একটি জিপ গাড়ি কেনার জন্য ১ কোটি ৬৯ লাখ ১ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাবও পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। সভার সম্মানী ভাতা বাবদ দুই কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং সফ্টওয়্যার খাতে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাবও প্রকল্পের প্রশাসনিক ব্যয়ের অংশ হিসেবে রয়েছে।

মূল্যায়ন কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী, জনস্বার্থ ও বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান বাছাই করতে হবে। কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের আওতায় নেওয়া যাবে না। একইভাবে আগে সরকারি সহায়তা পাওয়া প্রতিষ্ঠানও নতুন করে এ প্রকল্পের বরাদ্দ পাবে না। নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর শুধু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করা যাবে।

কমিশন আরও জানিয়েছে, সীমানাপ্রাচীরে টাইলস বসানো, প্রতিষ্ঠানের বাইরের দেয়ালে টাইলস লাগানো কিংবা ফটক দৃষ্টিনন্দন করার মতো সৌন্দর্যবর্ধনমূলক কাজে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় করা যাবে না। প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে জনসম্পৃক্ততা ও এলাকার বাস্তব প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা এলাকাভিত্তিকভাবে সাজিয়ে ডিপিপিতে যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকার ‘সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২’ বর্তমানে জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। চলমান প্রকল্পটির জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি ছিল মাত্র ৪৪ দশমিক ০৪ শতাংশ। প্রকল্পের মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে এলেও অর্ধেকের বেশি কাজ বাকি থাকায় এর ধীরগতির কারণ এবং নতুন প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। চলমান প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে প্রয়োজনীয় অর্থ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকল্পটির মূল্যায়ন প্রতিবেদন নতুন প্রকল্প প্রস্তাবের সঙ্গে সংযুক্ত করার নির্দেশও দিয়েছে কমিশন।

প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের এসব বিষয় সংশোধন করে ২ হাজার ৫৯০ কোটি টাকার ‘সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের’ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।