প্রাচীন রোমান সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি ভার্জিল সেই কবে বলেছিলেন, ‘খারাপ জিনিসের পথ সবসময় উন্মুক্ত এবং সহজ, কিন্তু কল্যাণের পথ সংকীর্ণ ও পরিশ্রমসাধ্য’। আমাদের সমাজ বাস্তবতায় এর সত্যতা যেন মেলে অহরহ। আমরাও মনে করি, দুষ্কর্মের শুরুটা হয় সহজভাবে এবং ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে, কিন্তু এর শেষটা হয় ধ্বংসাত্মক। ২৩ সেপ্টেম্বর ‘হাত বাড়ালেই ককটেল, বিস্ফোরণে পাঁচ হাজার’ দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনের এই শিরোনামটির গর্ভে যা উঠে এসেছে তা খ্যাতিমান রোমান কবি ভার্জিলের উক্তিটির মর্মার্থ আরও গভীরভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচিতে সহিংসতা ঘটানোর অন্যতম বড় উপকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ককটেল নামক বিস্ফোরক বস্তুটি। গত কিছুদিন ধরে রাজধানীতে ধারাবাহিকভাবে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। ইতিমধ্যে এর অভিঘাতগ্রস্ত হয়েছেন অনেকেই এবং সংগতকারণেই তা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। অপরাধী এবং রাজনৈতিক দলের কতিপয় নীতিবিবর্জিত কর্মী খুব সহজেই স্থানীয় বাজার থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক সামগ্রী সংগ্রহ করে এই বিস্ফোরক তৈরি করছে। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে এর বহুমাত্রিক তথ্যও মিলেছে।
ঢাকার কোন কোন স্থানে, কারা, কীভাবে প্রাণঘাতী বিস্ফোরক বস্তু ককটেল তৈরি ও সরবরাহ করছে এবং ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা নিজেদের ও মানুষের জীবন কত তুচ্ছতুল্যর কাতারে নামিয়ে এনেছে তা ভাবতে শুধু বিস্ময়ই নয়, সামনে দাঁড় করে কাতারবদ্ধ প্রশ্নও। ককটেল ইতিমধ্যে কত প্রাণপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে, কত জীবন পঙ্গু করে দুর্বিষহ করে তুলেছে, কত পরিবারে ছড়িয়েছে গাঢ় অন্ধকার; এর হিসাব মেলানো ভার। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে সেগুলোর ধ্বংস ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেশি। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী টিমের এডিসি ও ঢাকা মহানগর পুলিশের এক অতিরিক্ত কমিশনার দেশ রূপান্তরের কাছে এই বিস্ফোরক বস্তু তৈরির আধুনিক প্রক্রিয়া ও ব্যবহারকারীদের সম্পর্কে আরও তথ্য দিয়েছেন। এই সমাজ ও রাষ্ট্রে মানবজীবনে ক্ষতিকর বা হানিকর অনেক কিছুর সহজলভ্যতা এবং এর ভয়াবহ পরিণতির আরও অনেক নজিরই আমাদের সামনে রয়েছে।
কখনো ব্যক্তিগত তুচ্ছ বা হীনস্বার্থ, কখনো রাজনৈতিক কদর্য সমীকরণে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যে প্রাণঘাতী বিস্ফোরক বস্তু সমাজবিরোধী কিংবা বিপথগামী রাজনৈতিক কর্মীদের হাতের নাগালে আসার পথ প্রশস্ত করে দিল, আগে এর উৎসে নজর দেওয়া জরুরি। যে সমাজ অবক্ষয়ের ঢেউয়ে উথাল-পাতাল, যে সমাজে অশিক্ষা-কুশিক্ষার প্রভাবে যুবসমাজের একাংশ ক্ষয়ে ক্ষয়ে ধুঁকছে, নৈতিক ও সামাজিকভাবে চরম অবক্ষয়ের মুখোমুখি ও কর্মহীনতার অভিশাপে কষাঘাতে দিগি¦দিক; তাদের কাছে জীবন মূল্যহীন। তারা অপশক্তির হাতিয়ার হয়ে একদিকে নিজেদের আরও ধ্বংসের গহ্বরে নিপতিত করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ও জীবন বিপন্ন করার বিনাশী কাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে! এরা এমন ফাঁদে পা দিয়েছে, যা খুব সহজেই তাদের বলবান বিপথগামীদের মুঠোবন্দি করে রেখেছে, মুক্তির দরজা রুদ্ধ করে। এ থেকে নিষ্কৃতির পথ বের করতেই হবে। প্রথমেই জরুরি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর কঠোর নজরদারি ও যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা এবং এর সমান্তরালে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকদের রাজনীতিকে পঙ্কিলতা মুক্ত করা। আমরা মনে করি, রাজনীতি যদি অনাচার-দুরাচার-কদাচারের ছায়ামুক্ত হয়ে প্রকৃতই জনকল্যাণের মাধ্যমরূপে ফিরে এবং অর্জন করে তার হৃত শ্রী, তাহলে জীবনবৈরী কর্মকা-ের পথ স্বাভাবিকভাবেই সঙ্কুচিত হয়ে একপর্যায়ে এমনিতেই রুদ্ধ হবে।
অপকর্মের হোতাদের সম্পর্কে, ককটেল-হাতবোমাসহ প্রাণঘাতী বস্তুর তৈরি-প্রক্রিয়ায় যেসব বিস্ফোরক উপকরণ দরকার এসব তথ্য সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে মিলেছে। তা ছাড়া গোয়েন্দাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও নিশ্চয় আরও তথ্য আছে। আমাদের স্মরণে আছে, অতীতে বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনের ওয়েবসাইটে বোমা তৈরির সহজপাঠ তুলে ধরা হয়েছিল। আমরা এও মনে করি, এগুলোর সূত্র ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যূথবদ্ধভাবে শিকড় উৎপাটন যথাযথ পদক্ষেপ নিলে সুফল না মেলার অবকাশ ক্ষীণ। দরকার শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সরকারের নির্মোহ অবস্থান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মহলকে কথা নয়, কাজে প্রমাণ দিতে হবে দক্ষতা ও পেশাদারত্বের। অর্থাৎ যূথবদ্ধ প্রচেষ্টায় সমাজবিরোধী চক্রের আঁতুড়ঘর ভাঙতে সমন্বিত প্রয়াসের বিকল্প নেই।