সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ, হত্যা। যেকোনো অপরাধের পর প্রশ্ন হওয়া উচিত কে অপরাধটি করল। কেন এবং কীভাবে এর বিচার নিশ্চিত হবে? অথচ আমরা এর আগেই শিশুর জীবনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাই। বলি সে কী ব্যবহার করত, কার সঙ্গে মিশত, কোথায় যেত। কিন্তু তা কেন? ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকান্ড তদন্তের বিষয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়। পরদিন মরদেহ পাওয়া যায়। ২০ সেপ্টেম্বর পুলিশ জানিয়েছে, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে পরিকল্পিতভাবে নির্জন এলাকায় হত্যা করা হয়েছে এবং ফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে, যা পুলিশের বক্তব্য। এটি চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু সামাজিক আলোচনায় দ্রুত অন্য প্রশ্ন এসে যায় সে আইফোন ব্যবহার করত কেন? কার সঙ্গে মিশত? তার বন্ধুত্ব কেমন ছিল? অভিভাবকরা কতটা নজর রাখতেন? প্রশ্নগুলো নিজে অপরাধমূলক নয়। কিন্তু একটি তথ্য কখন তদন্তের অংশ আর কখন ভুক্তভোগীর চরিত্রের বিচারে পরিণত হয় সীমারেখাটি সেখানে। অপরাধের তদন্ত আর ভুক্তভোগীর ‘নৈতিক’ বিচার এক জিনিস নয়। অপ্রতিমের যোগাযোগ, চলাফেরা বা ফোনের তথ্য তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিশুটির চরিত্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত সত্য নয়।
পার্থক্যটি মৌলিক। সে কী করত তথ্য; সে কেমন ছিল মূল্যায়ন; তার আচরণের কারণে যা ঘটেছে causal claim, যার জন্য প্রমাণ প্রয়োজন। অপরাধের দায় নির্ধারিত হয় অপরাধীর কাজ, অভিপ্রায় ও প্রমাণের ভিত্তিতে। ভুক্তভোগীর কতটা, কী ধরনের আদর্শ ছিল, তার ভিত্তিতে নয়। আমাদের সহমর্মিতার ভেতর কি কোনো অদৃশ্য শর্ত কাজ করে? ভুক্তভোগীটি যথেষ্ট ভালো ছিল? শান্ত, বাধ্য, মেধাবী ছাত্র, প্রযুক্তি থেকে দূরে এমন শিশুর জন্য সহানুভূতি সহজ। কিন্তু সে ফোন ব্যবহার করলে বা বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে গেলে, আমাদের ভাষা কি বদলে যায়? একজন মানুষ ভুক্তভোগী হওয়ার আগে, নৈতিকভাবে নিখুঁত হওয়ার কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করে আসে না। একটি শিশু ভুল করতে পারে, এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা বড়রা অনুমোদন করবে না। তবু তার বিরুদ্ধে অপরাধ করার অধিকার কেউ পায় না। অপ্রতিমের সঙ্গে আটক তুহিনের সম্পর্ককে প্রতিবেদনে ‘অসম বন্ধুত্ব’ বলা হয়েছে। ১৩ বছরের শিশুর সঙ্গে অপেক্ষাকৃত বড় কারও যোগাযোগ তদন্তের অংশ হতে পারে। কিন্তু একে শিশুটির নৈতিক চরিত্রের মূল্যায়নে ব্যবহার করা আলাদা বিষয়। ‘অসম’ শব্দটি কেবল বয়স বা অবস্থানের পার্থক্য বোঝাচ্ছে, নাকি নৈতিক সন্দেহ জুড়ে দিচ্ছে সেটিও দেখা দরকার। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়ে থাকলে, অপরাধীরা মূল্যবান বস্তু দখল করতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, ১৩ বছরের শিশুর কাছে আইফোন ছিল কেন? শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহার বা অভিভাবকত্ব নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। তবে কোনোভাবেই সেটি হত্যার দায়ের সঙ্গে মেশানো যায় না। মূল্যবান ফোন থাকা অপরাধের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু মৃত্যুর দায় নয়। অপ্রতিমের জন্য মা-বাবা কতটা দায়ী, এটি প্রমাণ ছাড়া বলা যায় না। দুটিকে এক করলে অপরাধের বিচার parenting-এর বিচারসভায় পরিণত হয়। একটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; স্কুল, সমাজ ও রাষ্ট্র সবার নিজ নিজ দায়িত্ব আছে। ভয়াবহ অন্যায়ের মুখোমুখি হলে, একটি অসহ্য বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন। অনেক সময় ভালো মানুষের সঙ্গেও ভয়াবহ অন্যায় ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ কখনো নির্দোষ ভুক্তভোগীকে দায়ী করতে পারে। তখন ‘এমন ঘটনা নিশ্চয় কোনো কারণে ঘটেছে’ এই ব্যাখ্যা ভুক্তভোগীর ওপর দায় সরিয়ে দেওয়ার পথ তৈরি করে। Defensive attribution-এও ভুক্তভোগীকে নিজের থেকে ‘অন্যরকম’ করে দেখানোর একটি তাত্ত্বিক পথ আলোচিত হয়েছে। গবেষণা সম্ভাব্য কাঠামো দেয় এটি অপ্রতিমকে ঘিরে প্রত্যেক ব্যক্তির আচরণের সরাসরি ব্যাখ্যা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অনুমান ধীরে ধীরে সামাজিক সত্যের মতো দেখতে শুরু করতে পারে। ‘মা-বাবার আরও নজর রাখা উচিত ছিল’ একজন বলল, আরেকজন দেখল, তারপর সে-ও বলল। অনেকে বলছেন এটি একটি সামাজিক ঘটনা। সত্য প্রমাণিত হয়েছে এটি একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক দাবি। দুটিকে এক করা যাবে না। এর মানে, অপ্রতিমকে দেবদূত বানানো বা কোনো ভুল অস্বীকার করা নয়। বরং কোনটা তদন্তের তথ্য আর কোনটা চরিত্রের রায় তা আলাদা করা। যা সত্য, শুধু সেটুকু বলব। যা প্রমাণিত নয়, তাকে চরিত্রের রায়ে পরিণত করা যাবে না। ভুক্তভোগীর অসম্পূর্ণতাকে তার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের নৈতিক অনুমতিপত্র বানাব না, এটাই জ্ঞানতাত্ত্বিক সততা। Victimology অনুযায়ী, ভুক্তভোগী বা তার পরিবারকে অবিশ্বাস, দোষারোপ, অপমান, কলঙ্ক বা অবমূল্যায়নের মতো অতিরিক্ত সামাজিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়; এটি secondary victimization তৈরি করতে পারে, যেখানে শোকের জায়গা আত্মপক্ষ সমর্থনে রূপ নেয়। অপ্রতিম আর নিজের পক্ষে কথা বলতে পারবে না। তাই আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত তাকে কীভাবে সেখানে নেওয়া হলো? কারা নিল? কোন স্বার্থে বা উদ্দেশ্যে শিশুকে হত্যার মতো অপরাধ সম্ভব হলো? অপ্রতিম ভালো বা আদর্শ সন্তান ছিল কি না, তা সুবিচারের পূর্বশর্ত নয়। একটি সভ্য সমাজের আসল পরীক্ষা শুধু অপরাধী ধরায় নয়। যে কথা বলতে পারছে না, তার সম্পর্কে আমরা কীভাবে কথা বলছি, সেই আচরণে প্রকাশ পায় নিজস্ব মানসিকতা। তখন মানবিকতার রূপটি আপনাতেই নিজেকে প্রকাশ করে।
লেখক : কণ্ঠশিল্পী ও সংগীত পরিচালক
aananasrin@gmail.com