জাতিসংঘে ‘মিথ্যার’ পসরা ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে চলছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অনুসারে এবারের অধিবেশনেও ব্রাজিল প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভার পর ভাষণ দেন আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৩৭ মিনিটের এই ভাষণে-ইরান যুদ্ধ, গ্রিনল্যান্ড, জলবায়ু পরিবর্তন, ওয়াশিংটনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশ্ব শান্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি। তবে এবারও নিজের ভাষণে অনেক ‘বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা’ দাবি করেছেন তিনি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রচেষ্টার পাশাপাশি প্রতিপক্ষদের হেয় করতেও ছাড়েন নি ট্রাম্প। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতিসংঘে ট্রাম্পের এবারের ভাষণটি গত বছরের চেয়ে কিছুটা কম বিস্ফোরক ছিল। ট্রাম্পের ভাষণের সময় ওয়াকআউটের ঘটনাও ঘটেছে। নিউ ইয়র্কে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে ট্রাম্প বক্তব্য দেওয়ার সময় ইরানের প্রতিনিধিদল সভাকক্ষ ত্যাগ করে। ভাষণে কিউবাকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করেন ট্রাম্প। তার এই মন্তব্যের প্রতিবাদে অধিবেশনস্থল ত্যাগ করে কিউবান প্রতিনিধি দল।

ভাষণে তিনি জানান, ইরান প্রসঙ্গে তিনি একটি ‘বড় সিদ্ধান্তের’ মুখোমুখি হয়েছেন। তার সামনে এখন দুটি বিকল্প। তিনি ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে পারেন অথবা দেশটিকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে প্রক্রিয়াটিকে আরও দ্রুত করতে পারেন। তবে হুমকি দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রত্যাশাও করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, নির্বাচনের পরপরই আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব। কারণ চুক্তি না করাটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।’ তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের আগে গণমাধ্যমকে ট্রাম্প জানান, তেহরান ও ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদের মধ্যে তিন ঘণ্টার বৈঠকটি ‘খুবই ভালো’ ও ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ হয়েছে। ‘খুব শিগগির’ দুপক্ষ আবারও বৈঠকে বসবে বলেও জানান তিনি। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে আছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সেখানেই গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি শর্ত দিয়েছে ইরান। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অবিলম্বে তুলে নেওয়া, ইরানের জব্দ করা সম্পদ অবিলম্বে অবমুক্ত করা এবং সব কটি ‘প্রতিরোধ ফ্রন্টে’ যুদ্ধের অবসান ঘটানো।

ট্রাম্পের মিথ্যার ফুলঝুরি : বরাবরের মতো এবারও ট্রাম্প তার ভাষণে মিথ্যার ফুলঝুরি ছুটিয়েছেন। ট্রাম্প অনেক আগে থেকেই আটটি যুদ্ধ বন্ধের দাবি করে আসছেন। নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে অবিহিত করে দাবিটি পুনর্ব্যক্ত করে ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর আটটি যুদ্ধ বন্ধ করতে পেরেছি। এটা আমার জন্য বড় সম্মানের।’ তবে ট্রাম্পের বলা এ ‘আটটি যুদ্ধের’ সংখ্যা স্পষ্টতই অতিরঞ্জিত। কেননা, ট্রাম্পের তালিকায় এমন দুটি ঘটনা আছে, যেগুলো তার দায়িত্ব নেওয়ার সময় আদৌ ‘যুদ্ধ’ ছিল না। মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে বিরোধটি ছিল একটি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে কূটনৈতিক বিরোধ। সার্বিয়া ও কসোভোর পরিস্থিতিও ‘যুদ্ধ’ ছিল না। অস্ত্রভা-ারে টান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভা-ারে কোনো ঘাটতি নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এত বেশি অস্ত্র আছে, তা কখনো ব্যবহার করার কথাও ভাবতে পারি না। আমরা এমন মাত্রায় অস্ত্র তৈরি করছি, যা আগে কখনো করিনি।’ তবে গত সপ্তাহে পেন্টাগন ও কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের পৃথক দুটি প্রতিবেদনে অস্ত্রের মজুদ কমে আসার তথ্য উঠে এসেছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিষয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ শব্দটি বদলে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ বা জলবায়ু পরিবর্তন করা হয়েছে। কারণ, পৃথিবী নাকি উষ্ণ হওয়ার বদলে ঠান্ডা হচ্ছিল। আর এ কারণে কেউ মারাও যায়নি। ট্রাম্পের এই বক্তব্যে অন্তত চারটি ‘ভুল’ আছে। ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ শব্দটি এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শব্দটিও প্রচলিত। ট্রাম্প কোনো সময়ের কথা বলেছেন, সেটা স্পষ্ট নয়। তবে পৃথিবী ঠান্ডা হচ্ছে, এমন দাবির কোনো ভিত্তি নেই; বরং পৃথিবী আরও উষ্ণ হচ্ছে। রেকর্ড রাখা শুরুর পর ২০২৩-২০২৫ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ তিনটি বছর। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে ট্রাম্পের এসব দাবির সঙ্গে একমত নন বিশেষজ্ঞরা।