রয়েসয়ে স্থানীয় নির্বাচন করতে চায় বিএনপি

স্থানীয় সরকার নির্বাচন চলতি বছর করে ফেলার পক্ষে ছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংসদের বিরোধী দলও এ বছরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পক্ষে ছিল। ভোট ইস্যুতে বিরোধী দল জামায়াত ইসির সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করেছে। ফলে চলতি বছরই ভোট হবে রাজনীতির মাঠে এ আওয়াজই বেশি ছিল। তবে শুরু থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বুঝেশুনে চলার কৌশল নেয় ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। চলতি বছর নির্বাচন হওয়ার বিষয়টি কৌশলগত কারণেই খোলাসা করেনি তারা।

বিভিন্ন মহলে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছর স্থানীয় নির্বাচনে আগ্রহী না হওয়ার পেছনে ভিন্ন চারটি কারণ রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় দেড় যুগ বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে থেকে দমন-পীড়নের মুখে রাজনীতি করতে হয়েছে। ফলে সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটাতে পারেনি তারা। এখন ক্ষমতায় এলেও সাংগঠনিকভাবে পুরোপুরি ঘুছিয়ে উঠতে পারেনি দলটি। সংগঠনে অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকট, আছে বিশৃঙ্খলাও। প্রশাসনও ঘুছিয়ে তুলতে পারেনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রশাসনে ‘আওয়ামী ভূত’ রয়েছে বলে মনে করেন বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা।

ইসি সূত্র জানায়, রাজনৈতিক দলগুলোর এবং ইসির পরিকল্পনার গরমিল থেকে ভোট নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা ছিল। সরকারি দল বিএনপির অনাগ্রহে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছে ইসি। সর্বশেষ ইসির পক্ষ থেকে এ বছর নির্বাচন হবে না বলে আভাস দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বুধবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমও চলতি বছর নির্বাচন না হওয়ার ব্যাপারে জানিয়েছেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন যেভাবে কথা বলেছে, তাতে আমার কাছে মনে হচ্ছে না যে, এ বছর নির্বাচন হবে। তারা যেহেতু ৬ জুন শেষ সময় দিয়েছে, সেহেতু মনে হয়; আগামী বছরে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কমিশন।’ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তারা সচিব কমিটির মিটিং করে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, আবার মিটিং করবে। এ মাসের শেষে অথবা অক্টোবরের ফার্স্ট উইকে আরেকটি মিটিং করে তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। আমাদের প্রতিনিধিরা সেখানে থাকবে।’ তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যে নির্বাচনগুলো যেন তারা শেষ করে, শুরুর বিষয়ে আমি কিছু বলব না। শুরুটা তারাই ঠিক করবে। আমি যদি শুরুটা বলে দিই, তাহলে নির্বাচন কমিশনের জন্য তা বিব্রতকর হবে।’ নির্বাচন কমিশন আগামী বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। রাজনৈতিক দল ও ইসি সিদ্ধান্তহীনতায় থাকলেও মাঠ পর্যায়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাজনীতি সরগরম হতে থাকে। সরকারি দল বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ব্যানার-পোস্টারে সয়লাব করে দিয়েছে। ভোটারের দরজায় দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেছে। ভোটের মাঠে যতভাবে এগিয়ে থাকা যায়, তার সব চেষ্টাই প্রার্থীরা করে যেতে থাকেন। বিরোধী দল জামায়াতও বসে নেই। জোটগতভাবে জামায়াত স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে সভা-সমাবেশ নিয়ে ব্যস্ত। সরকারি ও বিরোধী দলের বাইরে স্থানীয়ভাবে ভাবমূর্তি সম্পন্ন বিভিন্ন ব্যক্তিও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জনসম্পৃক্ত নানা রকম কাজ চালায়। নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ার কারণে দলের বাইরে সাধারণের কাতারের মানুষও প্রার্থী হিসেবে নানাভাবে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। তারা প্রচারণা চালাচ্ছেন। গ্রামে-গঞ্জে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আমেজ লক্ষণীয়ভাবে অনুভূত হয়। পদ-পদবি নেই কিন্তু আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাসী একটি অংশও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নানা কর্মপরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এ ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান আওয়ামী লীগ নেতাদের ভোট করতে বাধা নেই বলে ঘোষণা দেওয়ায় আওয়ামী লীগের অনেকেই ভোটের কৌশল গ্রহণ করছেন।

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও মনে করেন, ৫ আগস্ট ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়া আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় অনেকখানি এগিয়েছে। দেশের মানুষের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। আওয়ামী লীগকে মোকাবিলার ধরন কী হবে, তা পুরোপুরি ঠিক করেনি বিএনপি। তাদের মধ্যে জামায়াত-ভীতিও আছে। জামায়াতকে মোকাবিলায়ও পলিসি নিতে হবে সরকারকে। চলতি বছর স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনে এ বিষয়গুলো অনাগ্রহী করে তুলেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারকে। ভোটের মাঠে জামায়াতের রাজনীতি সংঘাত-সংঘর্ষের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। জামায়াত আন্দোলনে রয়েছে। বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটসহ নানা সংকটে দেশের মানুষ বিক্ষুব্ধ। দিল্লিতে আশ্রিত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার প্রসঙ্গ রাজনীতিতে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। এত বৈরী পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটাতে পারে। এসব বিষয় আমলে নিয়ে চলতি বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনাগ্রহী বিএনপি।

বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতাও কিছু কারণ তুলে ধরেছেন। তারা বলেন, নভেম্বরে মাধ্যমিক স্কুলগুলোর বার্ষিক পরীক্ষা। এ সময়ে ছেলেমেয়ের পরীক্ষা নিয়ে বাবা-মায়েরা ব্যস্ত থাকবেন। ফলে ভোটের প্রতি অভিভাবকদের অনীহা থাকবে। তাই চলতি বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ভাবছে না বিএনপি। তবে স্থানীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকুক তা চায় ক্ষমতাসীন বিএনপি।

বিএনপির অপর একটি অংশ স্থানীয় নির্বাচন খুব বেশি পেছানোর পক্ষে নয়। কারণ, সরকারের শুরুর সময়টা এক রকমভাবে যায়। আর মাঝামাঝি সময় ও শেষ দিকের সময় আরেক রকমভাবে যায়। শুরুতে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা থাকে। ক্ষোভ, সমালোচনা এসব কম থাকে। তাই শুরু দিকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হলে ভোটের ফল বিএনপির পক্ষে থাকার সম্ভাবনা বেশি। এ অংশটি মনে করে, আগামী বছরের শুরুর তিন মাসের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করে ফেলাই সঠিক সিদ্ধান্ত হবে।

আগামী বছরের মার্চ মাসের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে দাবি করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য। বেশি সময় নিলে সরকারের প্রতি ক্ষোভ বাড়বে মানুষের। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে সরকারি দল বিএনপিকে নির্বাচনী মাঠে চাপে রাখার চেষ্টা করবে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে কিছু দিন আগে বলেছিলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিশ্চয় হবে। গ্রাম-গঞ্জে স্থানীয় নির্বাচনের আবহ ফুটে উঠেছে। কখন হবে সেটি এখনি সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, এ নির্বাচন অনেক বড় আয়োজন। একটু ভিন্নতাও আছে। তবে এ বছর নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা কম দেখা যাচ্ছে।