একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি সহযোগিতার মাধ্যমে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করে জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘ইউজিসি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন: বর্তমান সরকার ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের নীতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান’ শীর্ষক সেমিনারে মূল বক্তার বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অধ্যাপক মামুন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে শিল্প খাতের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে নতুন প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবা উদ্ভাবনের পাশাপাশি সেগুলোর বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ তৈরি হবে। যৌথ গবেষণা, শিল্পের অর্থায়নে গবেষণা, যৌথ গবেষণাগার এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে উদ্ভাবনকে আরও প্রয়োগমুখী করা সম্ভব।
গবেষণার ফল বাণিজ্যিকীকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, গবেষণা থেকে উদ্ভাবন, উদ্ভাবন থেকে নমুনা পণ্য, নমুনা পণ্য থেকে বাণিজ্যিকীকরণ এবং বাণিজ্যিকীকরণ থেকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এটাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।
ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এই সদস্য বলেন, শিল্প খাতের চাহিদা ও পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, পাঠ্যক্রম ও গবেষণার সমন্বয় প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও শিক্ষানবিশ কার্যক্রম চালু এবং শিল্পের চাহিদাভিত্তিক পাঠ্যক্রম আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর ক্যারিয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, অতিথি শিক্ষক, পরামর্শক ও প্রকল্প তদারকিতে যুক্ত করার কথা বলেন অধ্যাপক মামুন। তৃতীয় ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে তৃতীয় ভাষা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু ‘আমি কোথায় চাকরি পাব’—এই চিন্তায় সীমাবদ্ধ না থেকে ‘আমি কোন সমস্যার সমাধান করতে পারি, কী পণ্য বা সেবা তৈরি করতে পারি এবং কীভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারি’—সেই চিন্তায় তাঁদের উৎসাহিত করতে হবে।
তিনি জানান, ক্যাম্পাস থেকেই উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে ‘সিড ফান্ডিং’ বা ‘ইনোভেশন গ্রান্ট’ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ‘উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট’ ও ‘সায়েন্স পার্ক’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।
অধ্যাপক মামুন বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীল শিল্পেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিল্প খাতের সংযোগ বাড়াতে হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্টার্টআপ তহবিলের জন্য ৫০০ কোটি টাকা এবং সৃজনশীল অর্থনীতি খাতের উন্নয়নে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর খাত থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণায় দেশে ও বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের একটি প্ল্যাটফর্মে এনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে সমাজ ও অর্থনীতির বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগানোও এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
অধ্যাপক মামুন জানান, একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি সহযোগিতা জোরদারে ইউজিসি ও সরকার যৌথ গবেষণা, গবেষণায় অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। এ ধরনের সহযোগিতায় ইউজিসির অর্থায়নের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ ও সৃজনশীল শিল্পের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীদারিত্ব বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি আরও জানান, সহযোগিতা জোরদারে আগামী নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ‘একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন ডে’ পালনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী ও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম।