‘ঘুষ ছাড়া দলিল নিবন্ধন করেন না সাবরেজিস্ট্রার আবদুস সোবহান’

আদালতে জবানবন্দিতে বললেন ফারুক ইসলাম ও রূপণ দাশ

‘দলিলে সামান্য ত্রুটি পেলেই মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন সাবরেজিস্ট্রার আবদুস সোবহান। তিনি ঘুষ ছাড়া কোনো দলিল নিবন্ধন করেন না। আমরা ছোট পদে চাকরি করি। ঘুষের টাকা থেকে দিন শেষে সামান্য পাই। এক আইনজীবীর দলিল নিবন্ধনে দুই লাখ টাকা ঘুষ সাবরেজিস্ট্রারের নির্দেশেই নেওয়া হয়েছিল।’ এই বক্তব্য চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ের উমেদার রূপণ দাশের।

গত মঙ্গলবার এক আইনজীবীর দেওয়া অভিযোগ পেয়ে পাহাড়তলী সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে অভিযান চালায় দুদক। এ সময় ঘুষের দুই লাখ টাকাসহ সাবরেজিস্ট্রার আবদুস সোবহান, হেড ক্লার্ক ফারুক ইসলাম ও উমেদার রূপণ দাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল বুধবার সাবরেজিস্ট্রার আবদুস সোবহানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে দুদক, চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-১-এ মামলা দায়ের করেন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক সাঈদ এমরান।

ঘুষের টাকাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদক চট্টগ্রামের উপপরিচালক মো. আল আমিন। তিনি বলেন, ঘুষের দুই লাখ টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার দুজন ঘটনা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘুষ লেনদেনের পুরো চক্রটিকে শনাক্ত করতে দুদকের তদন্ত অব্যাহত আছে।

এরপর গতকাল বুধবার রাতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলমগীর হোসেনের আদালতে ঘটনার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন ফারুক ইসলাম ও রূপণ দাশ। জবানবন্দি দেওয়ার পর কারাগারে নেওয়ার পথে উমেদার রূপণের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি বলেন, দলিল নিবন্ধন (রেজিস্ট্রি) করার সময় সাবরেজিস্ট্রারের নির্দেশেই তাঁরা ঘুষ নিয়েছেন।

জবানবন্দিতে হেড ক্লার্ক ফারুক ইসলাম বলেন, ‘সাবরেজিস্ট্রার আবদুস সোবহানের নির্দেশে ঘুষের দুই লাখ টাকা নিয়েছি। ওই টাকা উমেদার রূপণ দাশের মাধ্যমে আমার কাছে পাঠানো হচ্ছিল। এরই মধ্যে মঙ্গলবার বিকেলে দুদকের একটি দল এসে আমাদের কার্যালয়ে হাজির হয়। তারা ঘুষের দুই লাখ টাকা, সাবরেজিস্ট্রারসহ আমরা তিনজনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।’

উমেদার রূপণ দাশ তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, ‘দুদক যে দলিলটি নিবন্ধনে ঘুষ নেওয়ার অপরাধে আমাদের গ্রেপ্তার করেছে, সেটির সরকারি ফি ১৫ হাজার টাকা। আমরা বাড়তি দুই লাখ টাকা ঘুষ হিসেবে নিয়েছি। প্রথমে তাঁরা ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা নেন। পরে আরও ২০ হাজার টাকা কমিশনে গেলে নেওয়ার কথা ছিল। দলিলদাতাদের একজন উপস্থিত হতে না পারায় বাসায় কমিশন যাওয়ার কথা ছিল। দলিলটিতে কোনো ত্রুটি ছিল না। এরপরও ঘুষ হিসেবে বাড়তি দুই লাখ টাকা নিয়েছি সাবরেজিস্ট্রারের নির্দেশে।’

দুদক সূত্র জানায়, এক আইনজীবী তাঁর মক্কেলের দুটি অংশীদারি চুক্তিপত্র নিবন্ধনের জন্য নগরের আদালত ভবনে অবস্থিত পাহাড়তলী সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ে যান। দলিল দুটিতে কোনো ত্রুটি না থাকলেও নিবন্ধন আটকে রাখা হয়। পরে ওই আইনজীবী দুদকের ‘হটলাইন ১০৬’ নম্বরে অভিযোগ করেন। অভিযোগের পর মঙ্গলবার বিকেলে তিনি ঘুষের টাকা দিতে যান। এ সময় অভিযান চালিয়ে ঘুষের দুই লাখ টাকাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে দুদক। পরে এ ঘটনায় মামলা হয়।

পরদিন গতকাল গ্রেপ্তার তিনজনকে আদালতে হাজির করা হলে দুজন জবানবন্দি দেন। দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোকারম হোসেন বলেন, পাহাড়তলী সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ের হেড ক্লার্ক ফারুক ইসলাম ও উমেদার রূপণ দাশ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তৃতীয় আদালতে ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এতে তাঁরা দলিল নিবন্ধনে সাবরেজিস্ট্রারের নির্দেশে দুই লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। জবানবন্দি দেওয়ার পর সাবরেজিস্ট্রারসহ তিনজনকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন আদালত।