ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার একটি গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে সারি সারি তালগাছ। কোথাও গাছের ডালপালা মাথার ওপর ছায়া তৈরি করেছে, কোথাও ঝুলছে পাকা তাল। সবুজে ঘেরা সড়কটি দেখলে মনে হয়, কোনো সাজানো বাগানের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে এই সবুজ সড়কের পেছনে নেই কোনো সরকারি প্রকল্প বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ। একজন ইমামের ৩৪ বছরের শ্রম, অর্থ ও ভালোবাসায় বদলে গেছে সড়কটির চেহারা।
ওমরপুর ইউনিয়নের বাউল সড়কসহ গ্রামের বিভিন্ন সড়কে দীর্ঘদিন ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল (৬০)। পেশায় ইমাম এই ব্যক্তি প্রায় দুই যুগ ধরে ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদে ইমামতি করছেন। এর পাশাপাশি ১৯৯৩-৯৪ সাল থেকে বৃক্ষরোপণকে নিজের জীবনের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় আট লাখ টাকা দিয়ে ভূঁইয়ারহাটে একটি নার্সারি গড়ে তোলেন রেজাউল কিবরিয়া। সেখানে চারা উৎপাদনের পাশাপাশি নিজ হাতে বিভিন্ন স্থানে গাছ লাগাতেন। মাইকিং করে স্থানীয় মানুষকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিনা মূল্যে অনেককে চারা বিতরণ করতেন তিনি।
রেজাউল কিবরিয়ার দাবি, গত তিন দশকের বেশি সময়ে তিনি প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছেন। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার। নানা কারণে অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণ থেকে সরে আসেননি তিনি। বর্তমানে নিজের নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন প্রজাতির চারা কিনে এনে সড়কের পাশে লাগাচ্ছেন।
বাউল সড়ক তার দীর্ঘদিনের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমের অন্যতম দৃশ্যমান উদাহরণ। সড়কের দুই পাশে বড় হয়ে ওঠা তালগাছগুলো পথচারী ও কৃষকদের ছায়া দিচ্ছে। বদলে গেছে পুরো সড়কের পরিবেশ। শুধু বাউল সড়ক নয়, বর্তমানে ওমরপুর গ্রামের আরও চারটি সড়কের পাশে চারা লাগানো ও পরিচর্যার কাজ করছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এসব গাছ সড়কের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি নানা কাজে আসছে। তালপাতা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়, আবার তালগাছ থেকে জ্বালানিও পাওয়া যায়। গাছে ফল ধরলে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয় বাড়তি আনন্দ।
বিকেলের দিকে সড়কটির পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। গাছের ছায়ায় স্থানীয় যুবক-কিশোররা সময় কাটান। অনেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসেন। সারি সারি তালগাছের সৌন্দর্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসছেন। অনেকে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও তুহিন বলেন, রেজাউল কিবরিয়া হুজুরের লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে ফল দিচ্ছে। সড়কের দুই পাশে শত শত তালগাছ থাকায় এলাকাটি আগের তুলনায় অনেক সুন্দর হয়েছে। তার বৃক্ষরোপণ দেখে তারাও নিজেদের জমিতে বেশি করে গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রেজাউল কিবরিয়ার কাছে বৃক্ষরোপণ শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি এটিকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখেন। মসজিদের জুমার খুতবা ও ধর্মীয় আলোচনায়ও মুসল্লিদের বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করেন তিনি।
রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘মূলত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ইহকাল ও পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশেই প্রায় তিন যুগ ধরে ইমামতির পাশাপাশি রাস্তার পাশে নানা ধরনের বৃক্ষরোপণ করে আসছি। শুরুটা করেছি ১৯৯৩-৯৪ সালে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে ভূঁইয়ারহাটে নার্সারি স্থাপনের মধ্য দিয়ে। তখন মাইকিং করে মানুষকে বিভিন্ন গাছের চারা দিয়েছি এবং গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করেছি।’
তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত প্রায় ৫০-৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে শুধু তালগাছের বীজই রয়েছে প্রায় ২৫-৩০ হাজার। নানা কারণে সব গাছ টিকিয়ে রাখতে পারিনি। এরপরও গাছ লাগানো ও পরিচর্যা বন্ধ করিনি।’
বজ্রপাতের বিষয়টিও তার বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। রেজাউল কিবরিয়া বলেন, কয়েক বছর ধরে বজ্রপাত বাড়ায় মানুষের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তালের বীজ ও চারা লাগানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে মাঝেমধ্যে বন বিভাগের পরামর্শও নেন।
তিনি বলেন, ‘আমি গাছ লাগাই সদকায়ে জারিয়া হিসেবে। গাছ মানুষের জন্য কতটা উপকারী, পবিত্র কোরআন ও হাদিসেও তার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। একটি গাছ লাগানো মানে শুধু আজকের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি সম্পদ তৈরি করা।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে রেজাউল কিবরিয়া বলেন, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে গড়ে তুলতে চান তিনি। যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার কাজ চালিয়ে যেতে চান।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ বলেন, গাছ লাগানো একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের দীর্ঘদিনের এই উদ্যোগের বিষয়টি আগে তাঁর জানা ছিল না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
৩৪ বছর আগে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে ছোট একটি নার্সারি দিয়ে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন রেজাউল কিবরিয়া বাবুল, সময়ের সঙ্গে তা পরিণত হয়েছে বড় বৃক্ষরোপণ উদ্যোগে। তার লাগানো গাছগুলো এখন বড় হয়ে ছায়া ও ফল দিচ্ছে। বদলে দিচ্ছে গ্রামের সড়কের চেহারা। একজন মানুষের দীর্ঘদিনের শ্রম ও ভালোবাসায় গড়ে ওঠা এই সবুজ সড়ক এখন স্থানীয়দের কাছে হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার উদাহরণ।