‘সকল লোকের মাঝে ব’সে/আমার নিজের মুদ্রাদোষে/আমি একা হতেছি আলাদা?/ আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?’ বোধ, জীবনানন্দ দাশ। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে মনে হয় মানুষের অভাব নেই। যানজট, কোলাহল, ভিড় সবকিছু মিলিয়ে জীবন যেন অবিরাম গতিশীল। কিন্তু দৃশ্যমান ভিড়ের ভেতরে লুকিয়ে আছে নীরব শূন্যতা একাকিত্ব। এমন অনুভূতি, যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু গভীরভাবে অনুভব করা যায়। আধুনিক সভ্যতার এই নিঃসঙ্গতা আজ ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে সামাজিক ব্যাধি, অদৃশ্য মহামারীতে পরিণত হয়েছে। এক সময় পরিবার ছিল, মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। যৌথ পরিবারে বড় হওয়া মানুষদের কাছে একাকিত্ব ছিল প্রায় অচেনা শব্দ। দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, ভাই-বোন সবাই মিলে একটি উষ্ণ সামাজিক পরিম-ল তৈরি করত, যেখানে দুঃখ-কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার জায়গা ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই কাঠামো ভেঙে গেছে। নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের চাপ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের প্রসারে পরিবার ছোট হয়েছে, সম্পর্কগুলোও সংকুচিত হয়েছে। একই ছাদের নিচে থেকেও মানুষ একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন।
নগরজীবনের যান্ত্রিকতা একাকিত্বকে আরও গভীর করেছে। ঘরে ফিরে টেলিভিশন বা মোবাইল ফোনে ডুবে থাকাই যেন একমাত্র আশ্রয়। কিন্তু এই আশ্রয় প্রকৃত অর্থে, মানুষকে আরাম দেয় না, বরং তাকে আরও একা করে তোলে। প্রযুক্তির উন্নয়ন নিঃসন্দেহে মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু এর একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার ‘বন্ধু’ থাকা সত্ত্বেও, বাস্তব জীবনে মানুষের সঙ্গে সংযোগ কমে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতে মানুষ নিজের একটি ‘সাজানো’ সংস্করণ উপস্থাপন করে যেখানে দুঃখ, ব্যর্থতা বা একাকিত্বের জায়গা নেই। তরুণ প্রজন্ম এই একাকিত্বের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। তারা একদিকে ক্যারিয়ার গড়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, অন্যদিকে সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার চাপে থাকে। পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নীলা (ছদ্মনাম) সবদিক থেকে সফল। ভালো ফল, সহপাঠীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি সবই রয়েছে তার জীবনে। কিন্তু বাস্তবে নীলা গভীর একাকিত্বে ভুগছিল। পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ সীমিত, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল অনেকটা আনুষ্ঠানিক। নিজের ভেতরের চাপ, হতাশা এবং অনিশ্চয়তা কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতে না পেরে সে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। একসময় তাকে কাউন্সেলিং নিতে হয়। চিকিৎসকের সহায়তায় সে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে ওঠে, কিন্তু তার অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় বাহ্যিক সফলতা কখনো মানসিক সুস্থতার নিশ্চয়তা নয়। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত হোসেন (ছদ্মনাম) দীর্ঘদিন ধরে পরিবার থেকে দূরে আছেন। অর্থনৈতিকভাবে তিনি সফল পরিবারের জন্য নিয়মিত অর্থ পাঠান, সন্তানদের ভালো শিক্ষা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু নিজের জীবনে চরম একাকিত্বে ভুগছেন। কাজের ফাঁকে কথা বলার মতো কেউ নেই, নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ নেই। ধীরে ধীরে একাকিত্ব তার মধ্যে বিষণœতা তৈরি করেছে। অনেক প্রবাসীর জীবনে এই বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়, যা খুব কমই আলোচনায় আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একাকিত্ব শুধু মানসিক সমস্যা নয়, এটি শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদি একাকিত্ব হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ঘুমের সমস্যা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এমনকি গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন একাকিত্বে ভোগা মানুষের মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ একাকিত্ব নিঃশব্দে মানুষের জীবনশক্তি ক্ষয় করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমস্যাটি আরও জটিল। এখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনো ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে একাকিত্ব বা বিষণœতাকে গুরুত্ব দেন না, বরং একে দুর্বলতা হিসেবে দেখেন। ফলে যারা এই সমস্যায় ভোগেন, তারা সাহায্য চাইতেও সংকোচ বোধ করেন। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি একাকিত্বকে আরও গভীর করে। তাহলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ? আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি। শুধু আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা নয়, বরং আন্তরিকভাবে অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একটি আন্তরিক আলাপ অনেক সময় মানুষের মানসিক চাপ কমিয়ে দিতে পারে। প্রযুক্তির ব্যবহার সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কমিউনিটি বা সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, কিংবা কোনো ক্লাবে যুক্ত হওয়া এসব কার্যক্রম মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে এবং একাকিত্ব কমাতে সাহায্য করে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে হবে। স্কুল, কলেজ এবং কর্মক্ষেত্রে কাউন্সেলিং সেবা চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ নির্দ্বিধায় সাহায্য নিতে পারে।
একাকিত্বকে অস্বীকার করা নয়, বরং স্বীকার করে নেওয়া এবং তা মোকাবিলার পথ খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ। বই পড়া, সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়া, কিংবা নিয়মিত ব্যায়াম এসব কার্যক্রম মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। আমাদের আরও সহানুভূতিশীল হতে হবে। যদি আশপাশের মানুষের খোঁজ নিই, তাদের কথা শুনি, তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিই তাহলে এই নিঃসঙ্গতার দেয়াল অনেকটা ভেঙে দেওয়া সম্ভব। মানুষ যেন মানুষের পাশে দাঁড়ায়, একে অপরের অনুভূতি বোঝে এমন একটি মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই নিঃশব্দ একাকিত্ব যদি আমরা গুরুত্ব না দিই, তবে এটি ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হতে পারে। সময় এসেছে, ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে না গিয়ে, মানুষকে মানুষ হিসেবে ফিরে পাওয়ার।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী, গবেষক ও বিশ্লেষক।
drharun.press@gmail.com