সুন্দর সমাজ গঠনে সালামের গুরুত্ব

পারস্পরিক শান্তি, ভালোবাসা ও নিরাপত্তা কামনার সুমহান মাধ্যম সালাম। আরবি সালাম শব্দের অর্থ শান্তি, কল্যাণ, নিরাপত্তা ও শুভকামনা। পারস্পরিক সাক্ষাৎকালে একে অপরের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি বর্ষণের দোয়া করার নামই সালাম। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণে সালামের প্রচলন সৌহার্দ্যপূর্ণ, হিংসামুক্ত ও সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি।

সালামের ধর্মীয় গুরুত্ব ও নির্দেশনা : ইসলামে সালাম দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। সালাম দেওয়া সুন্নত এবং সালামের জবাব দেওয়া ওয়াজিব। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সালাম প্রদানের শিষ্টাচার বর্ণনা করে বলেন, ‘যখন তোমাদের অভিবাদন করা হয় (সালাম দেওয়া হয়), তখন তোমরাও তার চেয়ে উত্তম অভিবাদন করো অথবা তারই অনুরূপ ফিরিয়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে হিসাব গ্রহণকারী।’ (সুরা নিসা ৮৬)

অপর আয়াতে ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে সালামের গুরুত্ব তুলে ধরে মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং যখন তোমরা কোনো ঘরে প্রবেশ করবে, তখন পরস্পরের প্রতি সালাম বলবে, যা আল্লাহর কাছ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন।’ (সুরা নুর ৬১)

ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা বৃদ্ধি : সালাম মানুষের অন্তরের অহংকার, হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করে হৃদয়ে ভালোবাসার সঞ্চার করে। একটি সুন্দর সমাজ কাঠামোর ভিত্তি হলো পারস্পরিক ভালোবাসা। সালামের মাধ্যমে একে অপরের জন্য যে মঙ্গল কামনা করা হয়, তা সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না ইমান আনবে। আর তোমরা মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন একটি কাজের কথা বলে দেব না, যা করলে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? তা হলো, তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।’ (সহিহ মুসলিম)

সামাজিক সমতা অর্জন : সালামের মাধ্যমে সমাজে ধনী-দরিদ্র, মনিব-ভৃত্য এবং ছোট-বড়র মধ্যকার বৈষম্য ও কৃত্রিম দূরত্ব দূর হয়। একজন বড় ব্যক্তি যখন ছোটকে বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যখন নিম্নপদস্থ কর্মচারীকে আগে সালাম দেন, তখন সেখানে বিনয় ফুটে ওঠে এবং সম্পর্কের উষ্ণতা বাড়ে।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করল, ইসলামের কোন আমলটি সবচেয়ে উত্তম?’ তিনি বললেন, তুমি (ক্ষুধার্তকে) অন্ন দান করবে এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেবে। (সহিহ বুখারি)

আগে সালাম দেওয়ার ফজিলত সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি সে, যে আগে সালাম দেয়। (সুনানে আবু দাউদ)

নিরাপদ সমাজ গঠন : সালামের মূল বার্তা হলো ‘সালামুন আলাইকুম’ অর্থাৎ আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এই বাক্যের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি অন্যকে এই মর্মে অঙ্গীকার দেয় যে, আমার হাত, মুখ বা আচরণ থেকে আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদ।

সমাজের প্রতিটি মানুষ যখন এই মানসিকতা লালন করবে, তখন চুরি, ডাকাতি, হিংসা-বিদ্বেষ ও সহিংসতা দূর হয়ে সমাজ এক নিরাপদ আবাসে পরিণত হবে।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় আগমন করার পর প্রথম যে উপদেশগুলো দিয়েছিলেন, তার অন্যতম ছিল, হে মানবজাতি! তোমরা সালামের বিস্তার ঘটাও, (ক্ষুধার্তকে) খাদ্য দান করো, আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখো এবং মানুষ যখন রাতে ঘুমিয়ে থাকে তখন নামাজ আদায় করো। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (জামে তিরমিজি)

নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ : ছোটবেলা থেকেই সালামের চর্চা শিশুদের মধ্যে বিনয়, আদব-কায়দা ও জ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলে। সালাম আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে সমাজে যে সৌজন্যবোধের সৃষ্টি হয়, তা সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

লেখক : শিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার