ঋজু ছোটবেলায় একবার গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল। তখন তার বয়স ছিল নয়-দশ বছর। সেই ভ্রমণের স্মৃতি আজও তার মনে খুব স্পষ্ট। গ্রামের অনেক কিছু সে ভুলে গেছে, কিন্তু নদীর কথা কিছুতেই ভুলতে পারেনি।
ঋজু শহরে বড় হয়েছে। চারদিকে দালানকোঠা, ব্যস্ত রাস্তা, গাড়ির শব্দ আর মানুষের ভিড় এটাই ছিল তার চেনা পৃথিবী। তাই সে জানত না, গ্রামের বাড়িতে যেতে এত কষ্ট করতে হয়। একদিন বাবা বললেন, ছুটিতে সবাই গ্রামে যাবে। ঋজু খুব খুশি হলো। সে ভাবল, গাড়িতে চড়বে আর কিছুক্ষণ পরেই পৌঁছে যাবে। কিন্তু যাত্রা অত সহজ ছিল না।
প্রথমে তাদের ট্রেনে যেতে হলো। ট্রেনের জানালা দিয়ে ঋজু বাইরে তাকিয়ে রইল। শহর পেরিয়ে মাঠ এলো, গাছ এলো, ছোট ছোট স্টেশন এলো। কোথাও গরু চরছে, কোথাও ধানক্ষেত দুলছে, কোথাও পুকুরে হাঁস ভাসছে। ট্রেন থেকে নেমে আবার অনেকটা পথ যেতে হলো। তারপর নদীর ঘাটে এসে নৌকায় উঠতে হলো।
নৌকায় ওঠার পর ঋজু যেন অন্য এক জগতে চলে গেল। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। আকাশটা অনেক বড় মনে হচ্ছিল। দুপুরের রোদ নদীর জলে ঝিকমিক করছিল। বাতাসে কেমন ঠা-া ঠা-া ভাব। সে নৌকার ধারে বসে পানি দেখছিল। মাঝি বৈঠা টানছিলেন, আর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ উঠছিল। সেই শব্দ শুনে ঋজুর মনে হলো, কেউ যেন গান গাইছে।
ঋজুর দাদা ছিলেন গ্রামের স্কুলের মাস্টারমশাই। সবাই তাকে সম্মান করত। তিনি শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। ঋজু পৌঁছাতেই দাদা তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। দাদি মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। উঠোনে গাছ, পাশে পুকুর, সামনে খোলা মাঠ সব দেখে ঋজুর খুব ভালো লাগল।
সন্ধ্যায় দাদা তাকে পাশে বসিয়ে নদীর গল্প বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, নদী শুধু পানি নয়, নদী হলো জীবন। নদী আছে বলেই মাঠে ফসল হয়, মানুষ মাছ পায়, নৌকা চলে, বাজার বসে।
পরদিন দাদা একটি মানচিত্র বের করলেন। ঋজু অবাক হয়ে দেখল, কাগজের ওপর কত লাইন, কত নাম! দাদা বললেন, এগুলো নদী। কোথা থেকে নদী এসেছে, কোথায় গিয়ে মিশেছে, কোন নদী থেকে খাল বের হয়েছে সব দেখালেন।
দাদা তাকে নিয়ে কাছের খালে গেলেন। খালের পানি শান্তভাবে বয়ে চলেছে। দুই পাশে ঘাস আর গাছ। কোথাও শাপলা ফুটে আছে। কোথাও পানকৌড়ি ডুব দিচ্ছে। ঋজু মুগ্ধ হয়ে সব দেখল। দুপুরবেলায় ফিরে এসে ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুম ভাঙতেই শুনলো, দূরে নদীর শব্দ। বাতাসে পানির গন্ধ। পাখির ডাকও ভেসে আসছে। শহরে সে এমন শব্দ কখনো শোনেনি। ঢাকায় গাড়ির হর্ন, মানুষের চিৎকার, ফেরিওয়ালার হাঁক এসব শোনা যায়। কিন্তু এখানে প্রকৃতির নিজস্ব শব্দ আছে।
ঋজু নদীর ধারে যেতে চাইলে দাদা বললেন, একা যেও না। নদী ভাঙছে।
ঋজু জিজ্ঞেস করল, নদী ভাঙার মানে?
দাদা তাকে নিয়ে নদীর পাড়ে গেলেন। দেখালেন, কোথাও মাটি ধসে পড়েছে। কোথাও গাছের শিকড় বেরিয়ে আছে। দাদা বললেন, নদীর স্রোতে পাড় কেটে যায়। একটু একটু করে জমি নদীর মধ্যে চলে যায়।
তিনি আরও বললেন, যদি এভাবে ভাঙতে থাকে, তাহলে একদিন এই বাজারও থাকবে না। তোমার বাবার স্কুলের অর্ধেকও নদীতে চলে যেতে পারে।
ঋজুর বুক ধক করে উঠল। সে ভাবল, স্কুল যদি নদীতে চলে যায়, তাহলে ছেলেমেয়েরা পড়বে কোথায়? বাজার না থাকলে মানুষ কেনাকাটা করবে কোথায়? নদী এত সুন্দর, আবার এত নিষ্ঠুর!
সে মনে মনে ভাবল, ঢাকায় ফিরে বাবাকে সব বলবে। নদী ভাঙা কি বন্ধ করা যায় না?
একদিন তারা বাজারে গেল। পথ কাদামাটিতে ভরা। হাঁটতে গিয়ে ঋজুর পা পিছলে যাচ্ছিল। তবু তার খুব আনন্দ হচ্ছিল। বাজারে গিয়ে সে দেখল, কত মানুষ! কেউ সবজি বিক্রি করছে, কেউ মাছ, কেউ কাপড়।
এক কোণে ময়রার দোকান। দাদা তাকে রসগোল্লা কিনে দিলেন। ঋজু মুখে দিয়েই চমকে উঠল। রসগোল্লায় এলাচের সুন্দর গন্ধ। নরম, মিষ্টি আর সুস্বাদু। সে বলল, দাদা, ঢাকার রসগোল্লা তো এমন না!
দাদা হেসে বললেন, গ্রামের খাঁটি জিনিসের স্বাদ আলাদা।
বাজারে জেলেরা নদী থেকে ধরা মাছ নিয়ে এসেছে। বড় মাছ, ছোট মাছ, চিংড়ি কত রকম মাছ! ওরা মাছ কিনল। ঋজু শুনল, অনেক জেলে নৌকাতেই রান্না করে, নৌকাতেই থাকে। নদীই তাদের ঘর, নদীই তাদের পথ।
ঋজু দাদাকে জিজ্ঞেস করল দাদা, তুমি সাঁতার জানো?
দাদা বললেন, জানি তো! ছোটবেলায় আমরা সবাই নদীতে সাঁতার কাটতাম।
ঋজু দেখল, গ্রামের ছেলেরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কাটছে। কেউ ডুব দিচ্ছে, কেউ ভেসে আছে। মেয়েরা কলসি নিয়ে নদী থেকে জল তুলছে। কেউ নদীতে কাপড় ধুচ্ছে। কেউ স্নান করছে। নদী যেন সবার আপনজন।
সেদিন ওরা আবার নৌকায় উঠল। মাঝি বৈঠা টানছিলেন। ছলাৎ ছলাৎ শব্দ উঠছিল নিয়ম করে। ঋজুর মনে হলো, এ যেন কোনো গানের তালে তালে চলছে। নদীর ওপারে তাকিয়ে সে দেখল, কালো মেঘ জমেছে। একটু পর বৃষ্টি নামল। আকাশ, মেঘ, বৃষ্টি আর নদী সব মিলিয়ে দৃশ্যটা এত সুন্দর ছিল যে ঋজুর মনে হলো, সে যেন সিনেমা দেখছে।
সে ভাবল, নদীতে না এলে সে জানতেই পারত না পৃথিবীতে এমন সৌন্দর্য আছে।
দাদা বললেন, দেখো, জোয়ার আসছে।
ঋজু দেখল, পানি ধীরে ধীরে বাড়ছে। দাদা বললেন, নদীতে জোয়ার-ভাটা হয়। কখনো পানি বাড়ে, কখনো কমে। কখনো দোকানের কাছ পর্যন্ত চলে আসে।
দাদা আরও বললেন, এখন অনেক নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। কোথাও নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। কোথাও সেতু হয়েছে। কোথাও বন্যায় নদীর পথ বদলে গেছে। নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, না হলে মানুষও কষ্ট পায়।
ঋজু বুঝতে পারল, নদী শুধু প্রকৃতির অংশ নয়। নদী আমাদের দেশের জীবন। নদী নিয়ে কত গান আছে, কত কবিতা আছে, কত গল্প আছে, কত ছড়া আছে, কত সিনেমা হয়েছে! মানুষ নদীকে ভালোবেসে মনে রেখেছে।
ছুটি শেষে ঋজু ঢাকায় ফিরে এলো। কিন্তু তার মন পড়ে রইল গ্রামে। মাঝে মাঝে সে চোখ বন্ধ করলে শুনতে পেত বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, নদীর বাতাস, পাখির ডাক।
ঋজু অনুভব করত, নদী শুধু বইয়ের বিষয় নয়। নদী মানে জীবন, সৌন্দর্য, আনন্দ, ভয়, সংগ্রাম আর স্মৃতি।